মদ ও আফিমের অভিযোগ: তাঁর নিজের শিক্ষা কী বলে?

একটি চিঠিতে ‘টনিক ওয়াইন’ শব্দটি দেখিয়ে বলা হয়, তিনি নেশায় আসক্ত ছিলেন। অথচ তাঁর নিজের হাতে লেখা বইয়ে আফিম, গাঁজা, ভাং থেকে শুরু করে সব নেশার বিরুদ্ধে স্পষ্ট নির্দেশ আছে।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

১৯০২ সাল। প্লেগে পাঞ্জাব কাঁপছে। এমন সময়ে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ছোট বই লিখলেন, নাম কিশতিয়ে নূহ, অর্থাৎ নূহের নৌকা। বইটিতে “আমাদের শিক্ষা” শিরোনামে তিনি তাঁর জামাতের জন্য আচরণবিধি লিখে দিলেন।

সেই বইয়ের একটি অনুচ্ছেদ এই আপত্তির সবচেয়ে বড় উত্তর। কিন্তু আগে আপত্তিটি শুনে নিই।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, মির্যা সাহেব মদ ও আফিমের নেশায় আসক্ত ছিলেন। প্রমাণ হিসেবে তাঁরা একটি চিঠির কথা বলেন, যেখানে তিনি লাহোরের এক অনুসারীর মাধ্যমে “টনিক ওয়াইন” নামের একটি জিনিস আনিয়ে নিতে বলেছিলেন।

অভিযোগটি গুরুতর, তাই খুব সাবধানে দেখা দরকার: চিঠিতে কী আছে, আর তাঁর নিজের শিক্ষা কী।

চিঠিটি কী বলে, আর কী বলে না

চিঠিতে “টনিক ওয়াইন” শব্দটি আছে, এ কথা জামাত অস্বীকার করে না। কিন্তু জামাতের আলেমরা কয়েকটি বিষয় দেখিয়েছেন। জিনিসটি আনানো হয়েছিল একজন ডাক্তারের মাধ্যমে, ওষুধ হিসেবে। সেকালে “টনিক ওয়াইন” ক্ষুধামন্দা ও দুর্বলতার ওষুধ হিসেবে বিক্রি হতো। আর চিঠির কোথাও লেখা নেই যে তিনি নিজে এটি পান করবেন বা করতেন।

একটি ওষুধের নাম লেখা চিঠি থেকে “নেশায় আসক্ত” রায় দেওয়া যায় না। আসক্তির দাবি করতে হলে সাক্ষ্য লাগে: কেউ কি কখনো তাঁকে নেশাগ্রস্ত দেখেছে? তাঁর প্রকাশ্য জীবন ছিল শত শত মানুষের চোখের সামনে।

✦

তাঁর নিজের শিক্ষা

এবার কিশতিয়ে নূহ-এর সেই অনুচ্ছেদ। ধনী ও ক্ষমতাবানদের সম্বোধন করে তিনি লিখেছেন:

“সব রকম বাড়াবাড়ি ছেড়ে দাও, আর প্রতিটি নেশাদ্রব্য থেকে দূরে থাকো। মানুষকে শুধু মদই ধ্বংস করে না; আফিম, গাঁজা, চরস, ভাং, তাড়ি আর অন্য সব নেশাও সমান ধ্বংসাত্মক। এগুলো বুদ্ধি নষ্ট করে, জীবন শেষ করে দেয়। তাই এসব থেকে পুরোপুরি বিরত থাকো। আমি বুঝি না, মানুষ কেন এসব নেশায় জড়ায়, যখন প্রতি বছর হাজার হাজার আসক্ত মানুষ এতে প্রাণ হারায়, পরকালের শাস্তির কথা তো বাদই দিলাম।” (কিশতিয়ে নূহ; আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত ইংরেজি অনুবাদ Noah’s Ark থেকে)

একই বইয়ে তিনি লিখেছেন, ইঞ্জিলের মতো কুরআন মাতাল না হওয়া পর্যন্ত মদ পানের অনুমতি দেয় না, বরং মদ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করেছে; নইলে মানুষ আল্লাহর দিকে যাওয়ার পথ হারায়। আর লিখেছেন, “তোমাদের নবী (সা.) সব ধরনের নেশা থেকে পবিত্র ছিলেন।”

যে মানুষ নিজের পুরো জামাতকে লিখিতভাবে আফিমের নাম ধরে তা ত্যাগ করতে বলেন, তিনি নিজে আফিমে আসক্ত ছিলেন, এ কথা মানতে হলে ধরে নিতে হয় তাঁর অনুসারীরা চোখ বন্ধ করে ছিল। অথচ সেই অনুসারীরাই তাঁর প্রতিটি দিন খুব কাছ থেকে দেখেছেন এবং তাঁর জীবনের ছোট-বড় ঘটনা লিখে রেখে গেছেন।

কুরআনের নির্দেশও তিনি এই শিক্ষার ভিত্তি করেছিলেন:

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنَّمَا الۡخَمۡرُ وَالۡمَیۡسِرُ وَالۡاَنۡصَابُ وَالۡاَزۡلَامُ رِجۡسٌ مِّنۡ عَمَلِ الشَّیۡطٰنِ فَاجۡتَنِبُوۡہُ لَعَلَّکُمۡ تُفۡلِحُوۡنَ
“হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! মদ এবং জুয়া এবং প্রতিমাসমূহ এবং ভাগ্য-নির্দেশক তীরসমূহ একান্ত নাপাক শয়তানী কার্যকলাপের অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং তোমরা এইগুলিকে বর্জন কর যেন তোমরা সফলকাম হইতে পার।”
সূরা আল-মায়েদা ৫:৯১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৫:৯০।

আরেকটি কথা লক্ষণীয়। কিশতিয়ে নূহ-এর একটি টীকায় তিনি লিখেছেন, ইউরোপে মদ যে ক্ষতি করেছে, তার একটি কারণ খ্রিস্টানদের ধারণা যে ঈসা (আ.) নিজে মদ পান করতেন, হয়তো কোনো অসুস্থতার কারণে বা পুরোনো অভ্যাসে। তারপর তিনি মুসলমানদের সম্বোধন করে বলেছেন: “কিন্তু হে মুসলমানেরা! তোমাদের নবী (সা.) সব ধরনের নেশা থেকে পবিত্র ছিলেন… তোমরা কোন কিতাবের ভিত্তিতে মদকে হালাল মনে করো? মৃত্যুর কথা কেন এত ভুলে আছ?” যিনি মদের বিরুদ্ধে এত তীব্র ভাষায় নিজের উম্মতকে সতর্ক করেছেন, তাঁর বিরুদ্ধে মদে আসক্তির অভিযোগ তাঁর লেখার সঙ্গে মেলে না।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

নাম যখন “ওয়াইন”, তখন তো এটি মদই?

এখানে কেউ কেউ বলেন, নামেই তো পরিচয়। কিন্তু নাম দিয়ে কোনো জিনিসের বিধান ঠিক হয় না, ব্যবহার আর প্রকৃতি দিয়ে হয়। সেকালে বহু ওষুধ অ্যালকোহল-মিশ্রিত দ্রবণ হিসেবে তৈরি হতো, আর ওষুধের দোকানে বিক্রি হতো। ওষুধ হিসেবে কোনো কিছু আনানো, আর নেশার জন্য মদপান: দুটি সম্পূর্ণ আলাদা কাজ। প্রথমটিকে দ্বিতীয়টির নামে চালানো ন্যায্য নয়।

তাঁর অসুস্থতার কথা কি এই অভিযোগকে সমর্থন করে না?

তিনি মাথাব্যথা (মাইগ্রেন), মাথা ঘোরা ও ডায়াবেটিসে ভুগতেন, আর এসবের চিকিৎসায় ওষুধ ব্যবহার করতেন। আলইসলাম ডট অর্গ উল্লেখ করেছে, অসুস্থতার কথা তুলে আপত্তি করা নতুন কিছু নয়; গোঁড়া খ্রিস্টান লেখকরা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধেও অসুস্থতার অপবাদ দিয়েছিল, আর কুরআন বলে, বিরোধীরা নবীদের পাগল ও জাদুকর বলত। অসুস্থ হওয়া আর ওষুধ খাওয়া কোনো নবীর জন্য দোষ নয়।

তিনি নিজে লিখেছেন, আল্লাহ জানতেন, তিনি যদি কুষ্ঠ, উন্মাদনা, অন্ধত্ব বা মৃগীর মতো কোনো নিন্দনীয় রোগে আক্রান্ত হন, বিরোধীরা একে আল্লাহর গজব বলবে; তাই আল্লাহ আগেই সুসংবাদ দিয়েছিলেন যে তিনি তাঁকে এমন প্রতিটি নিন্দনীয় রোগ থেকে রক্ষা করবেন। (আরবাঈন, ৩য় সংখ্যা, পৃষ্ঠা ৩০; আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত)

নেশায় আসক্ত মানুষ কি এত কাজ করতে পারে?

তিনি আশিটিরও বেশি বই লিখেছেন, অসংখ্য বিতর্কে অংশ নিয়েছেন, আরবিতে উচ্চাঙ্গের গ্রন্থ লিখে প্রতিপক্ষকে চ্যালেঞ্জ দিয়েছেন। বুদ্ধি নষ্ট করে দেওয়া নেশায় ডুবে থাকা মানুষের পক্ষে এর এক অংশও সম্ভব নয়। কুরআনে মহানবী (সা.)-কে নিজের সত্যতার পক্ষে বলতে শেখানো হয়েছে:

فَقَدۡ لَبِثۡتُ فِیۡکُمۡ عُمُرًا مِّنۡ قَبۡلِہٖ ؕ اَفَلَا تَعۡقِلُوۡنَ
“…নিশ্চয় আমি ইতিপূর্বে তোমাদের মধ্যে এক সুদীর্ঘ জীবন যাপন করিয়াছি, তবুও কি তোমরা বিবেক-বুদ্ধি খাটাইবে না?’”
সূরা ইউনুস ১০:১৭

যাঁর জীবন মানুষের চোখের সামনে খোলা বইয়ের মতো কেটেছে, তাঁর চরিত্রের সাক্ষী সেই জীবনই।

সংক্ষেপে

  1. অভিযোগটি একটি চিঠির “টনিক ওয়াইন” শব্দের ওপর দাঁড়ানো, যা ওষুধ হিসেবে আনানো হয়েছিল; এতে আসক্তির কোনো প্রমাণ নেই।
  2. কিশতিয়ে নূহ-এ তিনি মদ, আফিম, গাঁজা, ভাংসহ সব নেশা থেকে বিরত থাকতে জামাতকে স্পষ্ট নির্দেশ দিয়েছেন।
  3. কুরআন মদকে শয়তানী কাজ বলেছে, আর তিনি এই নিষেধকে নিজের শিক্ষার ভিত্তি করেছেন।
  4. তাঁর খোলামেলা জীবন, বিশাল লেখালেখি আর সাহাবীদের সাক্ষ্য এই অভিযোগকে ভিত্তিহীন প্রমাণ করে।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.