মদীনায় এক বেদুইন এসে মহানবী (সা.)-এর হাতে ইসলাম গ্রহণের বয়আত করলেন। পরদিন তাঁর জ্বর এল। তিনি ভাবলেন, ইসলাম গ্রহণের কারণেই এই অসুখ। মহানবী (সা.)-এর কাছে গিয়ে বললেন, “আমার বয়আত ফিরিয়ে নিন।” একবার, দুবার, তিনবার। প্রতিবার মহানবী (সা.) অস্বীকার করলেন। তারপর লোকটি মদীনা ছেড়ে চলে গেল।
তখন মহানবী (সা.) বললেন:
এই ঘটনা থেকে একটি প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়, যা আজ হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর বিরুদ্ধে তোলা হয়।
আপত্তিটি কী
একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ওপর যাঁরা ঈমান এনেছিলেন, যাঁদের তিনি আস্থাভাজন মনে করতেন, তাঁদের কয়েকজন পরে তাঁকে ছেড়ে গেছেন, এমনকি তাঁকে মিথ্যাবাদী বলেছেন। আপত্তিকারীদের মতে, তিনি সত্য হলে কেউ তাঁকে ছেড়ে যেত না।
কুরআন কী বলে
কুরআন মু'মিনদের আগেই জানিয়ে দিয়েছে যে তাদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ ফিরে যেতে পারে, আর তাতে সত্যের কোনো ক্ষতি হবে না:
আয়াতটি “হে যারা ঈমান এনেছ” বলে শুরু হয়েছে। অর্থাৎ ঈমানদারদের দল থেকেও কেউ কেউ দীন ছেড়ে যাবে, এ সম্ভাবনা আল্লাহ নিজেই বলে দিয়েছেন। সঙ্গে প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন: তাদের বদলে আল্লাহ নতুন মানুষ আনবেন, যাদের তিনি ভালোবাসবেন।
হযরত খলীফাতুল মসীহ আল-খামেস (আই.) এই আয়াত সম্পর্কে বলেছেন, এখানে মুরতাদদের বদলে অন্য লোক আনার কথা আছে, মৃত্যুদণ্ডের কোনো উল্লেখ নেই (জুমুআর খুতবা, ১ এপ্রিল ২০২২)। অর্থাৎ কেউ ফিরে গেলে আল্লাহর জামাতের জবাব হলো ধৈর্য আর বৃদ্ধি, প্রতিশোধ নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“নবীর একেবারে ঘনিষ্ঠ মানুষও কি ফিরে যেতে পারে?”
এখানে কেউ কেউ বলেন, সাধারণ মানুষ ফিরে যেতে পারে, কিন্তু যাঁকে নবী নিজে আস্থা করেছেন, তিনি ফিরে গেলে প্রশ্ন ওঠে। চলুন ইতিহাসের একটি ঘটনা দেখি। আব্দুল্লাহ ইবনে সা'দ ইবনে আবি সারাহ ছিলেন মহানবী (সা.)-এর ওহী লেখকদের একজন। হযরত মুসলেহ মওউদ (রা.)-এর তাফসীরে কবীর থেকে জানা যায়, তিনি মুরতাদ হয়ে মক্কায় চলে গিয়েছিলেন। মক্কা বিজয়ের দিন তিনি হযরত উসমান (রা.)-এর কাছে আশ্রয় নেন, আর হযরত উসমান (রা.) তাঁকে মহানবী (সা.)-এর সামনে নিয়ে আসেন। কিছুক্ষণ নীরব থাকার পর মহানবী (সা.) তাঁর বয়আত গ্রহণ করেন (সুনান আবু দাউদ, কিতাবুল জিহাদ, হাদীস ২৬৮৩)।
যিনি কুরআনের আয়াত নিজ হাতে লিখতেন, তিনিও একসময় ফিরে গিয়েছিলেন। কেউ কি এ কারণে মহানবী (সা.)-এর সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন? নাউযুবিল্লাহ, কখনো নয়।
“কেউ ছেড়ে গেলে কি জামাত দুর্বল প্রমাণ হয় না?”
কুরআন এর উত্তর দিয়েছে মহানবী (সা.)-এর জীবদ্দশাতেই:
সহীহ বুখারীতে আছে, কিয়ামতের দিন মহানবী (সা.)-এর উম্মতের কিছু লোককে বাম দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। তিনি বলবেন, “হে আমার প্রভু, এরা আমার সাথী!” উত্তর আসবে: “তুমি জানো না তোমার পরে তারা কী করেছে… তুমি তাদের ছেড়ে আসার পর থেকে তারা অবিরাম পেছনের দিকে ফিরে গেছে।” (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, হাদীস ৪৬২৫)। মহানবী (সা.)-এর পরে বহু আরব গোত্র ইসলাম ছেড়ে দিয়েছিল, যা ইতিহাসে সুপরিচিত এবং উল্লিখিত খুতবাতেও আলোচিত হয়েছে। তবু ইসলাম থেমে থাকেনি।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ক্ষেত্রেও তা-ই। কয়েকজন চলে গেছেন, কিন্তু তাঁর জামাত আজ পৃথিবীর বহু দেশে বিস্তৃত। সূরা আল-মায়েদার প্রতিশ্রুতি এখানেও পূর্ণ হয়েছে: যারা গেছে, তাদের বদলে আল্লাহ নতুন মানুষ এনেছেন।
“তিনি যাঁদের প্রশংসা করেছিলেন, তাঁরা ফিরে গেলে কি তাঁর বিচার ভুল প্রমাণ হয় না?”
নবীরা মানুষের বর্তমান অবস্থা দেখে আচরণ করেন; অন্তরের শেষ পরিণতি জানেন কেবল আল্লাহ। মহানবী (সা.) ওই বেদুইনের বয়আত নিয়েছিলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি সারাহকে ওহী লেখার দায়িত্ব দিয়েছিলেন। পরে তাঁরা ফিরে গেছেন, কিন্তু এতে মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা এক বিন্দুও কমেনি। কুরআন এমন লোকদের কথাও বলেছে, যারা “সাক্ষ্য দিয়েছিল যে এই রসূল সত্য, এবং তাদের কাছে সুস্পষ্ট প্রমাণ এসেছিল”, তারপর অস্বীকার করেছে (সূরা আলে ইমরান ৩:৮৭)। অর্থাৎ ঈমানের পরীক্ষা জীবনের শেষ পর্যন্ত চলে।
দাবিদারের সত্যতা যাচাইয়ের মানদণ্ড তাই কে থাকল আর কে গেল, তা নয়; বরং কুরআন, সুন্নাহ ও সহীহ হাদীসের আলোকে তাঁর দাবি, তাঁর জীবন আর আল্লাহর সাহায্য।
সিদ্ধান্ত: অনুসারীদের কারও ফিরে যাওয়া কোনো নবীর মিথ্যার প্রমাণ নয়; মহানবী (সা.)-এর যুগও এর সাক্ষী। কুরআনের মানদণ্ডে এটি বরং আল্লাহর জামাতের পরীক্ষার স্বাভাবিক অংশ।
সংক্ষেপে
- সূরা আল-মায়েদা (৫:৫৫) জানায়, ঈমানদারদের মধ্য থেকেও কেউ ফিরে যেতে পারে, আর আল্লাহ তাদের বদলে নতুন জাতি আনবেন।
- মহানবী (সা.)-এর যুগে এক বেদুইন বয়আত ফিরিয়ে চলে গেছে (সহীহ বুখারী ৭২০৯), আর এক ওহী লেখক মুরতাদ হয়ে পরে আবার ফিরে এসেছেন।
- কে গেল তা দিয়ে দাবিদারের সত্য-মিথ্যা নির্ধারিত হয় না; মহানবী (সা.)-এর মর্যাদা এসব ঘটনায় কমেনি।
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর জামাতের ক্রমবৃদ্ধি সূরা আল-মায়েদার প্রতিশ্রুতিরই পূর্ণতা।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Men of Excellence: Hazrat Abu Bakr (ra); Punishment of Apostasy in Islam, Friday Sermon 1 April 2022 · alislam.org
- Hazrat Wahab bin Sa'd bin Abi Sarh (ra) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.