অমৃতসরের ঈদগাহে মুবাহালা: মৌলভী আব্দুল হক গযনভীর সাথে কী হয়েছিল?

১৮৯৩ সালে অমৃতসরের ঈদগাহে একটি মুবাহালা হয়েছিল। আপত্তি ওঠে, মির্যা সাহেব আগে মারা গেছেন, তাই তিনি হেরেছেন। কিন্তু সেদিন কী দোয়া হয়েছিল, আর তারপর কী ঘটল?

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla
দাবি

বিরোধীরা বলেন, আব্দুল হক গযনভীর সাথে ১৮৯৩ সালের মুবাহালায় মির্যা সাহেব আগে মারা গেছেন, তাই তিনি হেরেছেন।

মূল তথ্য

মির্যা সাহেব দোয়া করেছিলেন, তিনি মিথ্যাবাদী হলে আল্লাহ যেন তাঁর ওপরই লা’নত দেন। কে আগে মরবেন, এমন শর্ত ছিল না। কুরআনের মুবাহালার আয়াতে (৩:৬২) লা’নতের কথা আছে, মৃত্যুর সময়সীমা নয়।

যাচাইয়ের রায়ভুল ব্যাখ্যা

এমন একটি শর্ত আরোপ করা হয়েছে, যা মুবাহালার দোয়ায় ছিল না।

বিস্তারিত নিচে ↓

১৮৯৩ সালের মে মাস। অমৃতসরের ঈদগাহে মানুষের ভিড়। আজ এখানে কোনো ঈদের নামায নয়, হবে মুবাহালা। একদিকে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.), অন্যদিকে গযনভী পরিবারের আলেম মৌলভী আব্দুল হক গযনভী, যিনি তাঁকে কাফের, মিথ্যাবাদী ও প্রতারক বলে প্রচার করছিলেন।

মুবাহালা মানে, দুই পক্ষ একসাথে আল্লাহর কাছে কাতরভাবে দোয়া করবে, যেন মিথ্যাবাদীর ওপর আল্লাহর লা’নত পড়ে। এটি হালকা বিষয় নয়, আর হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) মুসলমানদের সাথে মুবাহালায় যেতে চাইতেন না। মৌলভী আব্দুল হকের ঘরানার প্রবীণ বুযুর্গ মওলানা আব্দুল্লাহ গযনভী (রহ.)-কে তিনি গভীর শ্রদ্ধা করতেন। কিন্তু মৌলভী আব্দুল হক বারবার জোর দিলেন, শেষে তিনি রাজি হলেন।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা বলেন, মুবাহালার নিয়ম হলো মিথ্যাবাদী সত্যবাদীর জীবদ্দশায় ধ্বংস হয়। মির্যা সাহেব ১৯০৮ সালে মারা যান, আর মৌলভী আব্দুল হক তার পরেও জীবিত ছিলেন। তাই তাঁদের মতে, মুবাহালায় মির্যা সাহেব হেরেছেন।

সেদিন ঈদগাহে কী দোয়া হয়েছিল

প্রথমেই একটি বিষয় লক্ষ করার মতো। এই মুবাহালায় কে আগে মারা যাবেন, এমন কোনো শর্ত বা মেয়াদ ঘোষণা করা হয়নি। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) প্রতিপক্ষের মৃত্যু কামনা করেননি, তাঁর ওপর কোনো অভিশাপও দেননি। তিনি দোয়া করেছিলেন নিজের বিরুদ্ধে: বিরোধীরা তাঁকে যেমন মিথ্যাবাদী ও কাফের বলে, তিনি যদি সত্যিই তেমন হন, তবে আল্লাহ যেন তাঁর ওপর এমন লা’নত নাযিল করেন যা আগে কারও ওপর হয়নি।

অর্থাৎ ফয়সালার মাপকাঠি ছিল, আল্লাহর রহমত কার সঙ্গী হয়, আর কে লাঞ্ছিত হয়। মৃত্যুর আগে-পরে নয়।

একটু ভেবে দেখুন। যিনি নিজের দাবিতে সন্দিহান, তিনি কি জনসমক্ষে নিজের ওপরই এমন ভয়ংকর লা’নতের দোয়া করতে পারেন? মিথ্যাবাদী সাধারণত এমন পরীক্ষা এড়িয়ে চলে। আর লক্ষ করুন, তিনি প্রতিপক্ষের কোনো ক্ষতি চাননি। বিরোধিতার উত্তাপের মধ্যেও তাঁর দোয়া ছিল নিজের দিকে ফেরানো: সত্য তুমি জানো, তুমিই ফয়সালা করো।

✦

তারপর যা ঘটল

মুবাহালার পরের বছরগুলো দেখুন। ১৮৯৪ সালের রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ হলো, যাকে তিনি ইমাম মাহদীর নিদর্শন হিসেবে উপস্থাপন করলেন। একের পর এক আরবি ও উর্দু গ্রন্থ প্রকাশিত হলো। অনুসারীর সংখ্যা কয়েকশো থেকে হাজারে, তারপর আরও বহুগুণে বাড়ল। তাঁর পরিবারে সন্তান জন্ম নিল।

১৮৯৭ সালের ১৬ জানুয়ারি, আঞ্জামে আথম গ্রন্থে, তিনি সরাসরি মৌলভী আব্দুল হককে সম্বোধন করে মুবাহালার পর পাওয়া অনুগ্রহগুলোর কথা লিখলেন, আর একটি নির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী জুড়ে দিলেন: আল্লাহ তাঁকে বারবার চতুর্থ পুত্রের সুসংবাদ দিয়েছেন, আর আব্দুল হক ততদিন মারা যাবেন না যতদিন না এই ভবিষ্যদ্বাণী পূর্ণ হওয়ার খবর তাঁর কাছে পৌঁছায়; সামর্থ্য থাকলে তিনি দোয়া করে এই ভবিষ্যদ্বাণী ঠেকিয়ে দেখান (রূহানী খাযায়েন ১১, পৃ. ৩৪২)।

আড়াই বছর পর, ১৮৯৯ সালের ১৪ জুন, তাঁর চতুর্থ পুত্র মির্যা মুবারক আহমদের জন্ম হলো (তিরিয়াকুল কুলূব, রূহানী খাযায়েন ১৫, পৃ. ২২১)। মৌলভী আব্দুল হক তখন জীবিত, আর তিনি এই খবর জেনেছেন। কারও ঘরে পুত্র জন্মাবে, আর একজন নির্দিষ্ট প্রতিপক্ষ সেই পর্যন্ত বেঁচে থাকবেন, দুটোই কোনো মানুষ নিজের ক্ষমতায় নিশ্চিত করতে পারে না।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

মুবাহালায় কি মিথ্যাবাদীকে আগে মরতেই হয়?

এখানে কেউ কেউ বলেন, মুবাহালা মানেই মৃত্যুর প্রতিযোগিতা। চলুন কুরআনের মুবাহালার আয়াতটি দেখি:

فَقُلۡ تَعَالَوۡا نَدۡعُ اَبۡنَآءَنَا وَاَبۡنَآءَکُمۡ وَنِسَآءَنَا وَنِسَآءَکُمۡ وَاَنۡفُسَنَا وَاَنۡفُسَکُمۡ ۟ ثُمَّ نَبۡتَہِلۡ فَنَجۡعَلۡ لَّعۡنَتَ اللّٰہِ عَلَی الۡکٰذِبِیۡنَ
“…তাহাকে তুমি বল, আস, আমরা ডাকি আমাদের পুত্রগণকে এবং তোমাদের পুত্রগণকে, আমাদের নারীগণকে এবং তোমাদের নারীগণকে, এবং আমাদের লোকগণকে এবং তোমাদের লোকগণকে, অতঃপর কান্নাকাটি করিয়া দোয়া করি এবং মিথ্যাবাদীদের উপর আল্লাহ্‌র লা’নত যাচনা করি।’”
সূরা আলে ইমরান ৩:৬২
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩:৬১।

আয়াতে চাওয়া হয়েছে “লা’নত”, অর্থাৎ আল্লাহর রহমত থেকে বঞ্চিত হওয়া। মৃত্যুর কোনো সময়সীমা আয়াতে নেই। মুবাহালার ফল কী রূপে আসবে, তা আল্লাহর হাতে, আর প্রতিটি মুবাহালার শর্ত সেদিন যা ঠিক হয়, তা দিয়েই বিচার হয়। অমৃতসরের মুবাহালায় মৃত্যুর কোনো শর্তই ছিল না; দোয়া ছিল লা’নত ও লাঞ্ছনা নিয়ে।

তাহলে কে জয়ী হলেন, বোঝা যাবে কীভাবে?

কুরআন বলে, আল্লাহ তাঁর রসূলদের ও মু’মিনদের এই দুনিয়াতেই সাহায্য করেন:

اِنَّا لَنَنۡصُرُ رُسُلَنَا وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا
“নিশ্চয়ই আমরা আমাদের রসূলগণকে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে অবশ্যই সাহায্য করিব, পার্থিব জীবনেও…”
সূরা আল-মু’মিন ৪০:৫২

এবার দুই পক্ষের পরের ইতিহাস পাশাপাশি রাখুন। যিনি নিজের ওপর লা’নতের দোয়া করেছিলেন, মুবাহালার পর তাঁর কাজ, তাঁর জামাত ও তাঁর পরিবার বেড়েছে, তাঁর বাণী আজ পৃথিবীর বহু দেশে পৌঁছেছে। লা’নত মানে যদি আল্লাহর সাহায্য থেকে বঞ্চিত হওয়া হয়, তবে ফলাফল খুঁজে পেতে কষ্ট হয় না।

আগে মারা যাওয়াই যদি মাপকাঠি না হয়, তবে মুবাহালার কোনো অর্থ থাকে কি?

অর্থ থাকে, তবে সেটি মানুষের বানানো একটি মাত্র নিয়মে বাঁধা নয়। মহানবী (সা.) নিজেও তাঁর অনেক বিরোধীর আগে ইন্তেকাল করেছেন; তাতে কারও মনে প্রশ্ন জাগেনি যে বিরোধীরা জিতে গেছে। সত্যের বিজয় দেখা যায় দীর্ঘ সময়ে, আল্লাহর সাহায্য কার কাজকে টিকিয়ে রাখে তা দিয়ে। আর এই মুবাহালার পর যে সুনির্দিষ্ট ভবিষ্যদ্বাণীটি মৌলভী আব্দুল হককে সম্বোধন করে করা হয়েছিল, চতুর্থ পুত্রের জন্ম, তা অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে।

সংক্ষেপে

  1. ১৮৯৩ সালের মে মাসে অমৃতসরের ঈদগাহে মৌলভী আব্দুল হক গযনভীর পীড়াপীড়িতে মুবাহালা হয়।
  2. হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) প্রতিপক্ষের মৃত্যু চাননি; তিনি দোয়া করেছিলেন, তিনি মিথ্যাবাদী হলে আল্লাহ যেন তাঁর ওপরই লা’নত দেন। কে আগে মরবেন, এমন শর্ত ছিল না।
  3. কুরআনের মুবাহালার আয়াতে লা’নতের কথা আছে, মৃত্যুর সময়সীমা নয় (৩:৬২)।
  4. ১৮৯৭ সালে আঞ্জামে আথমে ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়, আব্দুল হক চতুর্থ পুত্রের জন্মের খবর না জেনে মারা যাবেন না; ১৪ জুন ১৮৯৯ মির্যা মুবারক আহমদের জন্মে তা পূর্ণ হয়।
  5. মুবাহালার পর যাঁর কাজ ও জামাত আল্লাহর সাহায্যে বেড়েছে, ফলাফলের সাক্ষ্য সেটিই।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

এই উত্তরটি ছড়িয়ে দিন ছবি ডাউনলোড WhatsApp Facebook

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.