হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কি জিহাদ বাতিল করেছিলেন?

তিনি তলোয়ারের জিহাদকে সেই যুগে ও সেই দেশে স্থগিত বলেছেন, কারণ তার শর্তগুলো ছিল না। আর তাঁর এই রায়ের সঙ্গে একমত ছিলেন তাঁর সবচেয়ে বড় বিরোধী আলেমরাও।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

একজন গরিব মানুষ, যাঁর ঘরে দুবেলা খাবার জোটে না, তাঁকে যদি কেউ বলেন, “যাকাত দিচ্ছ না কেন? যাকাত তো ফরয!” আমরা হাসব। যাকাত ফরয ঠিকই, কিন্তু নিসাব পূর্ণ হলে তবেই। একইভাবে হজ্জ ফরয, কিন্তু সামর্থ্য থাকলে তবেই।

ইসলামের প্রতিটি বিধানের সঙ্গে শর্ত জড়িয়ে আছে। শর্ত না থাকলে বিধান বাতিল হয় না, শুধু সেই মুহূর্তে প্রযোজ্য হয় না। তলোয়ারের জিহাদও এর ব্যতিক্রম নয়।

আপত্তিটি কী

একটি আপত্তি হলো: হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কুরআনের জিহাদের বিধান রহিত করেছেন, আর তা করেছেন ইংরেজ সরকারকে খুশি করতে। আপত্তিকারীদের কেউ কেউ ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে জিহাদ বলে দাবি করেন এবং বলেন, সেই চেতনা দমনের জন্যই এই শিক্ষা দেওয়া হয়েছিল।

তিনি আসলে কী বলেছেন

তাঁর একটি বক্তব্য এরকম: “নিঃসন্দেহে এই দেশে এ যুগে জিহাদের কারণগুলো বিদ্যমান নেই। তাই এই দেশের মুসলমানদের জন্য আজ ধর্মের নামে যুদ্ধ করা আর ইসলামী শরীয়ত অস্বীকারকারীদের হত্যা করা নিষিদ্ধ। শান্তি ও নিরাপত্তার সময়ে আল্লাহ তলোয়ারের জিহাদ স্পষ্টভাবে নিষেধ করেছেন।” (তুহফায়ে গোলড়বিয়া, পৃ. ৮২)

শব্দগুলো খেয়াল করুন: “এই দেশে”, “এ যুগে”, “শান্তি ও নিরাপত্তার সময়ে”। এটি চিরকালের জন্য বিধান বাতিলের ঘোষণা নয়, বরং একটি নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে শর্ত না থাকার রায়।

কুরআন তলোয়ার ধরার অনুমতি কখন দিয়েছে? যখন মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হচ্ছিল, আর শুধু “আল্লাহ আমাদের প্রতিপালক” বলার কারণে তাদের ঘরছাড়া করা হয়েছিল:

اُذِنَ لِلَّذِیۡنَ یُقٰتَلُوۡنَ بِاَنَّہُمۡ ظُلِمُوۡا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ عَلٰی نَصۡرِہِمۡ لَقَدِیۡرُ
“যাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইতেছে তাহাদিগকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার) অনুমতি দেওয়া হইল, কারণ তাহাদের উপর যুলুম করা হইতেছে, এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্য করিতে পূর্ণ ক্ষমতাবান—”
সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪০
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২২:৩৯।

ইংরেজদের আগে পাঞ্জাবে শিখ শাসনে মুসলমানদের ধর্মপালন কঠিন ছিল। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, আযান দেওয়ার কারণে একজন মুসলমানকে হত্যা পর্যন্ত করা হয়েছিল (১০ জুলাই ১৯০০-এর বিজ্ঞাপন)। ইংরেজ শাসনে মুসলমানরা মসজিদে আযান দিতে, নামায পড়তে আর ইসলাম প্রচার করতে স্বাধীন ছিলেন। যেখানে ধর্মের কারণে কেউ আক্রান্ত নয়, সেখানে কুরআনের এই শর্তও পূর্ণ নয়।

“তুহফায়ে কায়সারিয়া”-তে তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর যুগে ইসলামী জিহাদের ভিত্তি ছিল এই যে, যারা অন্যায়ভাবে মুসলমানদের বিরুদ্ধে তলোয়ার তুলেছিল এবং জুলুমের চরম সীমায় পৌঁছেছিল, তারা শাস্তির যোগ্য ছিল; কিন্তু যে সরকারের অধীনে স্বাধীনভাবে, পূর্ণ নিরাপত্তায় ধর্মীয় কর্তব্য পালন করা যায়, তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পরিকল্পনা জিহাদ নয়, অজ্ঞতা থেকে জন্ম নেওয়া এক বর্বর ধারণা।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“এটা কি ইংরেজদের খুশি করার জন্য বলা হয়নি?”

এখানে অনেকে বলেন, এ শিক্ষা আসলে ঔপনিবেশিক শাসকদের স্বার্থে। চলুন দেখি সে যুগের অন্য আলেমরা কী বলেছিলেন, যাঁরা হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ঘোর বিরোধী ছিলেন।

আহলে হাদীস নেতা মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী লিখেছেন: “যে সরকারের অধীনে মুসলমানরা নিরাপদে থাকে এবং স্বাধীনভাবে ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে পারে, সে সরকার ইহুদি, খ্রিস্টান বা অন্য যে ধর্মেরই হোক, তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা বা যুদ্ধকারীদের লোকবল ও অর্থ দিয়ে সাহায্য করা মুসলমানদের জন্য জায়েয নয়। অতএব ভারতের মুসলমানদের জন্য ব্রিটিশ সরকারের বিরোধিতা বা বিদ্রোহ হারাম।” (ইশাআতুস সুন্নাহ, খণ্ড ৬, সংখ্যা ১০)। তিনি আরও লিখেছেন, এখন জিহাদের সব শর্ত অনুপস্থিত, তাই কলকাতা থেকে পেশোয়ার পর্যন্ত কেউ ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারে না (ইশাআতুস সুন্নাহ, খণ্ড ৯, সংখ্যা ১)।

মৌলভী সৈয়দ নযীর হুসাইন দেহলভী ফতোয়া দিয়েছেন, এ দেশে জিহাদের শর্ত নেই, তাই এখানে জিহাদ করা ধ্বংস ও পাপ (ফতোয়ায়ে নযীরিয়া, খণ্ড ৪, পৃ. ৪৭২)। আর তিনিও ১৮৫৭ সালের বিদ্রোহকে শরীয়তের জিহাদ নয়, বরং চুক্তিভঙ্গ ও বিশৃঙ্খলা বলেছেন (ইশাআতুস সুন্নাহ, খণ্ড ৬, সংখ্যা ১০)।

যে রায় বিরোধী আলেমরা নিজেরাই দিয়েছেন, শুধু একজনের বেলায় তাকে ষড়যন্ত্র বলা ন্যায়বিচার নয়।

আর তিনি নিজেই প্রশ্ন তুলেছেন: সরকারকে খুশি করাই যদি উদ্দেশ্য হতো, তাহলে কেন বারবার ঘোষণা করতেন যে ঈসা (আ.) ক্রুশ থেকে রক্ষা পেয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, আর তিনি খোদা বা খোদার পুত্র নন? এতে তো খ্রিস্টান শাসকদের বিরক্ত হওয়ার কথা। তাঁর ভাষায়, কুরআন অনুযায়ী এমন সরকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ নিষিদ্ধ, যা ইসলাম ও তার পালনে কোনোভাবে হস্তক্ষেপ করে না (কিশতিয়ে নূহ, পৃ. ৬৮)।

“তাহলে কি জিহাদ চিরতরে শেষ?”

না। তলোয়ারের জিহাদের শর্ত কুরআনেই লেখা আছে, আর সেই শর্ত যেখানে পূর্ণ হবে, সেখানে আত্মরক্ষার যুদ্ধের অনুমতিও কুরআনেই আছে: “যারা তোমাদের সঙ্গে যুদ্ধ করে, আল্লাহর পথে তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করো, কিন্তু সীমালঙ্ঘন কোরো না” (সূরা আল-বাকারা ২:১৯১)। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) কুরআনের কোনো আয়াত বাতিল করেননি; তিনি দেখিয়েছেন, তাঁর যুগে ও দেশে সেই শর্ত পূর্ণ ছিল না।

“আহমদী মুসলমানরা তাহলে কোন জিহাদ করেন?”

কুরআন নিজেই কুরআন দিয়ে জিহাদকে “বৃহত্তর জিহাদ” বলেছে:

فَلَا تُطِعِ الۡکٰفِرِیۡنَ وَجَاہِدۡہُمۡ بِہٖ جِہَادًا کَبِیۡرًا
“অতএব তুমি কাফেরদের আনুগত্য করিও না, এবং তুমি ইহার (কুরআনের) সাহায্যে তাহাদের সহিত বৃহত্তর জিহাদ কর।”
সূরা আল-ফুরকান ২৫:৫৩

এই আয়াত মক্কী যুগের, যখন কোনো যুদ্ধ ছিল না। জিহাদ তিন ধরনের: নিজের নফসের বিরুদ্ধে, শয়তান ও তার শিক্ষার বিরুদ্ধে, আর ধর্মীয় স্বাধীনতার শত্রুর বিরুদ্ধে। মক্কী জীবনে মহানবী (সা.) তলোয়ার না তুলেও প্রতিটি মুহূর্ত জিহাদে কাটিয়েছেন। আহমদীয়া মুসলিম জামাত কুরআন অনুবাদ, মসজিদ নির্মাণ আর ইসলামের বাণী প্রচারের মাধ্যমে সেই কলমের ও কুরআনের জিহাদই করে চলেছে।

সিদ্ধান্ত: তিনি জিহাদ বাতিল করেননি; শর্ত না থাকায় তলোয়ারের জিহাদকে সেই যুগে স্থগিত ঘোষণা করেছেন, আর কুরআনের বৃহত্তর জিহাদের দিকে উম্মতকে ডেকেছেন।

সংক্ষেপে

  1. তিনি বলেছেন, “এই দেশে, এ যুগে” জিহাদের কারণ বিদ্যমান নেই; এটি শর্তের প্রশ্ন, বিধান বাতিলের নয়।
  2. কুরআন তলোয়ারের অনুমতি দিয়েছে তাদের, যাদের বিরুদ্ধে ধর্মের কারণে যুদ্ধ করা হচ্ছিল (২২:৪০); ইংরেজ শাসনে মুসলমানরা স্বাধীনভাবে ধর্মপালন করতেন।
  3. মৌলভী মুহাম্মদ হুসাইন বাটালভী ও মৌলভী নযীর হুসাইন দেহলভীর মতো বিরোধী আলেমরাও একই ফতোয়া দিয়েছেন।
  4. কুরআনের বৃহত্তর জিহাদ, অর্থাৎ কুরআন দিয়ে জিহাদ (২৫:৫৩), আহমদীয়া মুসলিম জামাতের প্রধান কাজ।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.