“খলীফাতুল্লাহিল মাহদী” হাদীসটি বুখারীতে নেই: তাহলে কি ভুল উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল?

একটি বইয়ে হাদীসটিকে বুখারীর বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এটি কি ইচ্ছাকৃত মিথ্যা, নাকি মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিভ্রম? নবীদের জীবন থেকেই উত্তর খুঁজি।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

রমযানের রাত। মসজিদে তারাবীর নামায চলছে। হাফেয সাহেব মুখস্থ কুরআন পড়ছেন। হঠাৎ একটি আয়াত বাদ পড়ে গেল, বা এক জায়গার শব্দ আরেক জায়গায় চলে গেল। পেছন থেকে কেউ লুকমা দিলেন, হাফেয সাহেব শুধরে নিলেন।

এই দৃশ্য আমাদের সবার চেনা। কেউ কি সেদিন বলেন, হাফেয সাহেব কুরআন বিকৃত করছেন? না। সবাই বোঝেন, এটি মানুষের ভুলে যাওয়া, ইচ্ছাকৃত কিছু নয়। আজকের আপত্তিটি বুঝতে এই সহজ কথাটি মনে রাখা দরকার।

আপত্তিটি কী?

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তাঁর শাহাদাতুল কুরআন পুস্তকে শেষ যুগের খলীফাদের সম্পর্কে হাদীসের কথা বলতে গিয়ে লিখেছেন, সেই খলীফা সম্পর্কে আসমান থেকে ডাক আসবে: “হাযা খলীফাতুল্লাহিল মাহদী”, অর্থাৎ “ইনি আল্লাহর খলীফা মাহদী।” সেখানে তিনি এসব হাদীসকে বুখারীর হাদীস হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

বিরোধীরা বলেন, এই শব্দগুলো সহীহ বুখারীতে নেই। তাদের দাবি, নিজের দাবিকে মজবুত করতে তিনি বুখারীর নামে এমন কথা চালিয়েছেন যা বুখারীতে নেই।

“খলীফাতুল্লাহিল মাহদী” কথাটি কারো মনগড়া নয়। হাদীসের প্রসিদ্ধ ছয় কিতাবের একটি, সুনানে ইবনে মাজাহতে হযরত সাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে মহানবী (সা.) পূর্ব দিক থেকে কালো পতাকার আগমনের কথা বলার পর বলেছেন:

فَإِذَا رَأَيْتُمُوهُ فَبَايِعُوهُ وَلَوْ حَبْوًا عَلَى الثَّلْجِ فَإِنَّهُ خَلِيفَةُ اللَّهِ الْمَهْدِيُّ
“যখন তোমরা তাঁকে দেখবে, তাঁর হাতে বয়আত করবে, বরফের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হলেও; কেননা তিনি আল্লাহর খলীফা মাহদী।”
সুনানে ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, হাদীস ৪০৮৪

তাহলে বিষয়বস্তু সঠিক, শব্দগুলোও হাদীসের ভাণ্ডারে আছে। প্রশ্ন শুধু এটুকু: কিতাবের নাম উল্লেখে ভুল হয়েছে কি না।

তিনি নিজেই জানতেন, বুখারী-মুসলিম মাহদীর হাদীস কী চোখে দেখেছে

যিনি ইচ্ছা করে বুখারীর নাম ব্যবহার করে মানুষকে ধোঁকা দিতে চান, তিনি মাহদী সম্পর্কিত হাদীসকে সবচেয়ে মজবুত বলে প্রচার করবেন। কিন্তু হযরত মসীহ মওউদ (আ.) করেছেন উল্টোটা।

তাঁর হাকীকাতুল মাহদী পুস্তকে তিনি পরিষ্কার লিখেছেন, মাহদীর আগমন সম্পর্কে যত রকম হাদীস আছে, সেগুলো সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য বা বিশুদ্ধ নয়। তিনি সেগুলোকে তিন ভাগে ভাগ করেছেন: কিছু বানানো, কিছু দুর্বল বা পরস্পরবিরোধী, আর কিছু বিশুদ্ধ, যেগুলো কেবল একজন হেদায়াতপ্রাপ্ত মাহদীর সুসংবাদ দেয়, যুদ্ধ-বিগ্রহের কথা নয়।

যিনি নিজে মাহদীর হাদীসের দুর্বলতা নিয়ে এত খোলাখুলি লিখেছেন, তিনি একই বিষয়ে বুখারীর নাম জাল করবেন, এটি যুক্তিতে টেকে না। অতএব এখানে যা ঘটেছে তা লেখার সময়ের স্মৃতিভ্রম বা কলমের ভুল, উদ্দেশ্যমূলক মিথ্যা নয়।

✦

নবীরাও মানুষ, তাঁরাও ভুলে যান

কেউ বলতে পারেন, আল্লাহর প্রেরিত ব্যক্তির কি ভুল হতে পারে? কুরআন নিজেই এর উত্তর দেয়। হযরত আদম (আ.) সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَقَدۡ عَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اٰدَمَ مِنۡ قَبۡلُ فَنَسِیَ وَلَمۡ نَجِدۡ لَہٗ عَزۡمًا
“এবং ইতিপূর্বে নিশ্চয় আমরা আদমকে (এক বিষয়ের) তাকিদ করিয়াছিলাম, কিন্তু সে ভুলিয়া গিয়াছিল এবং আমরা তাহার মধ্যে (আদেশ লঙঘনের) কোন সংকল্প পাই নাই।”
সূরা তাহা ২০:১১৬
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২০:১১৫।

লক্ষ করুন, আল্লাহ নিজেই বলছেন ভুলটি ছিল ভুলে যাওয়া, ইচ্ছাকৃত অবাধ্যতা নয়। হযরত মূসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীর ঘটনাতেও একই কথা:

فَلَمَّا بَلَغَا مَجۡمَعَ بَیۡنِہِمَا نَسِیَا حُوۡتَہُمَا
“অতঃপর, যখন তাহারা উভয়ে দুই সমুদ্রের পরস্পর সংগমস্থলে পৌঁছিল তখন তাহারা তাহাদের মাছের কথা ভুলিয়া গেল…”
সূরা আল-কাহফ ১৮:৬২

সবচেয়ে বড় উদাহরণ মহানবী (সা.) নিজে। একবার তিনি চার রাকাতের নামায দুই রাকাতে শেষ করে সালাম ফেরালেন। যুল ইয়াদাইন নামে এক সাহাবী জিজ্ঞেস করলেন, নামায কি কমে গেছে, নাকি আপনি ভুলে গেছেন? তিনি বললেন, “আমি ভুলিনি, নামাযও কমেনি।” সাহাবী বললেন, “না, আপনি ভুলেছেন।” তখন তিনি বাকি নামায পড়ে নিলেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ১২২৯)।

আরেকবার নামাযে ভুল হওয়ার পর তিনি নিজেই বললেন:

أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ، أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ، فَإِذَا نَسِيتُ فَذَكِّرُونِي
“আমি তোমাদের মতোই একজন মানুষ। তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও তেমনি ভুলে যাই। তাই আমি ভুলে গেলে আমাকে মনে করিয়ে দিও।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুস সালাত, হাদীস ৪০১

এসব ঘটনায় কোনো মুসলমান নবীদের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। কারণ নবুয়তের প্রমাণ হলো তাঁর শিক্ষা, তাঁর জীবন আর আল্লাহর সাহায্য; মানুষ হিসেবে কখনো কিছু ভুলে না যাওয়া নয়। তাহলে মহানবী (সা.)-এর একজন সেবকের লেখায় একটি কিতাবের নাম উল্লেখে ভুলকে “মিথ্যা” বলা ন্যায়সঙ্গত নয়।

শেষ কথা: যে মাপকাঠিতে এই আপত্তি তোলা হয়, সেই মাপকাঠি আদম (আ.), মূসা (আ.) আর মহানবী (সা.)-এর ওপর চালানো যায় না। তাই এটি ন্যায়ের মাপকাঠিও নয়।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“ইবনে মাজাহর এই হাদীসকে তো অনেক মুহাদ্দিস দুর্বল বলেছেন”

হ্যাঁ, এই বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদীস বিশারদদের মধ্যে আলোচনা আছে। কিন্তু লক্ষ করুন, এটি আমাদের কথাকেই মজবুত করে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজের দাবির ভিত্তি এই একটি বর্ণনার ওপর রাখেননি। উল্টো তিনি নিজেই লিখেছেন, মাহদী সম্পর্কিত হাদীসগুলো সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়।

তাঁর দাবির ভিত্তি ছিল কুরআন, মহানবী (সা.)-এর নিশ্চিত ভবিষ্যদ্বাণী, যুগের প্রয়োজন আর আল্লাহর নিদর্শন। যে উদ্ধৃতির ওপর দাবি দাঁড়িয়েই নেই, সেখানে কিতাবের নামে ভুলকে “দাবি মজবুত করার কৌশল” বলা যায় না।

“আল্লাহর প্রেরিত হলে তাঁর লেখায় ভুল থাকবে কেন?”

কারণ আল্লাহর প্রেরিতরা মানুষ, ফেরেশতা নন। কুরআন মহানবী (সা.)-কে দিয়েই এ কথা ঘোষণা করিয়েছে:

قُلۡ اِنَّمَاۤ اَنَا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ یُوۡحٰۤی اِلَیَّ
“তুমি বল, ‘আমিতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ, (কিন্তু) আমার প্রতি এই ওহী করা হয়…’”
সূরা আল-কাহফ ১৮:১১১

ওহী নির্ভুল, কারণ তা আল্লাহর। কিন্তু ওহীর বাইরে একজন মানুষ হিসেবে লেখা, স্মৃতি থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া, কিতাবের নাম মনে রাখা, এসবে মানবীয় ভুল হতে পারে। মহানবী (সা.)-এর নামাযের ঘটনা সেটিই দেখায়। নবীর সত্যতা মাপা হয় তাঁর বাণী আর আল্লাহর সাহায্য দিয়ে, স্মৃতির নির্ভুলতা দিয়ে নয়।

“তাহলে কি যেকোনো ভুলকে ‘স্মৃতিভ্রম’ বলে পার পাওয়া যাবে?”

না। ইচ্ছাকৃত মিথ্যা আর ভুলের পার্থক্য বোঝা যায় উদ্দেশ্য আর পরিপ্রেক্ষিত দেখে। এখানে উদ্ধৃত শব্দগুলো হাদীসের ভাণ্ডারেই আছে, লেখক নিজে মাহদীর হাদীসের দুর্বলতা নিয়ে খোলাখুলি লিখেছেন, আর তাঁর দাবি এই উদ্ধৃতির ওপর দাঁড়িয়েও নেই। ইচ্ছাকৃত জালিয়াতির কোনো লক্ষণ এখানে নেই। তাই এটি সরল ভুল, আর সরল ভুলকে মিথ্যা বলা ন্যায় নয়।

সংক্ষেপে

  1. “খলীফাতুল্লাহিল মাহদী” শব্দগুলো মনগড়া নয়; সুনানে ইবনে মাজাহর হাদীস ৪০৮৪-তে এগুলো আছে।
  2. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই লিখেছেন, মাহদী সম্পর্কিত হাদীস সামগ্রিকভাবে নির্ভরযোগ্য নয়; তাই বুখারীর নাম ইচ্ছা করে ব্যবহারের কোনো কারণ ছিল না।
  3. কিতাবের নাম উল্লেখে ভুল মানুষের স্বাভাবিক স্মৃতিভ্রম।
  4. কুরআন ও বুখারী সাক্ষী, আদম (আ.), মূসা (আ.) ও মহানবী (সা.)-ও ভুলে গেছেন; এতে তাঁদের সত্যতা কমেনি।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.