সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) শিখদের বিরুদ্ধে লড়লেন, ইংরেজদের বিরুদ্ধে নয় কেন?

ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদকে একবার ঠিক এই প্রশ্নটিই করা হয়েছিল। তাঁর উত্তর লেখা আছে তাঁর জীবনীতে, আর সেই উত্তরই প্রতিশ্রুত মসীহ (আ.)-এর জিহাদ-নীতির সবচেয়ে বড় সাক্ষী।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

উনিশ শতকের প্রথম ভাগ। রায়বেরেলির সৈয়দ আহমদ (রহ.) হাজারো অনুসারী নিয়ে উত্তর-পশ্চিম সীমান্তের দিকে রওনা হয়েছেন, শিখদের বিরুদ্ধে লড়তে। শত শত মাইলের কঠিন পথ, আফগান সীমান্তের পাহাড়।

পথে একজন প্রশ্ন করলেন: এত দূরে গিয়ে শিখদের বিরুদ্ধে লড়ছেন কেন? এ দেশের শাসক ইংরেজরাও তো ইসলাম অস্বীকারকারী। ঘরের কাছে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করে ভারত কেন কেড়ে নিচ্ছেন না? লাখো মানুষ আপনার সঙ্গে যোগ দেবে।

প্রশ্নটি আজও ওঠে, শুধু ভিন্ন রূপে।

আপত্তিটি কী

একটি আপত্তি হলো: ত্রয়োদশ হিজরি শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হযরত সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) শিখদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন। তাহলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কেন বললেন যে সে যুগে ভারতে তলোয়ারের জিহাদের শর্ত নেই? আপত্তিকারীরা এই উদাহরণ দিয়ে বোঝাতে চান যে ইংরেজদের বিরুদ্ধেও সশস্ত্র জিহাদ বৈধ ছিল।

সৈয়দ সাহেবের নিজের উত্তর

সৈয়দ আহমদ (রহ.)-এর জীবনীকার মৌলভী মুহাম্মদ জাফর থানেশ্বরী ওপরের ঘটনাটি লিখেছেন, আর সৈয়দ সাহেবের উত্তরটিও। সেই উত্তরের মর্ম:

সৈয়দ সাহেব বললেন, ইংরেজ বা শিখ কারও কাছ থেকে দেশ কেড়ে নিয়ে নিজে শাসন করার কোনো ইচ্ছা তাঁর নেই। শিখদের বিরুদ্ধে জিহাদের একমাত্র কারণ, তারা মুসলমানদের ওপর জুলুম করে এবং আযানের মতো ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে বাধা দেয়। শিখরা যদি জুলুম বন্ধ করে, তাদের সঙ্গে লড়ার আর কোনো কারণ থাকবে না। ইংরেজরা অমুসলিম, কিন্তু তারা মুসলমানদের ওপর কোনো জুলুম করে না, ইবাদতে বাধা দেয় না; মুসলমানরা তাদের অধীনে প্রকাশ্যে ধর্ম প্রচার ও পালন করে। তাঁর আসল উদ্দেশ্য আল্লাহর তওহীদ প্রচার আর মহানবী (সা.)-এর সুন্নাহ জীবিত করা, আর ইংরেজ শাসনে তিনি তা বিনা বাধায় করতে পারছেন। তাহলে কেন তিনি ধর্মের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে দুই পক্ষের রক্ত ঝরাবেন? এ উত্তর শুনে প্রশ্নকারী চুপ হয়ে গেলেন, জিহাদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝে। (সাওয়ানেহে আহমদী, পৃ. ৭১)

উত্তরটি আবার পড়ুন। জিহাদের কারণ শাসকের ধর্ম নয়, শাসকের জুলুম। যেখানে ধর্মের কারণে জুলুম, সেখানে আত্মরক্ষার অনুমতি; যেখানে ধর্মীয় স্বাধীনতা, সেখানে তলোয়ার নয়।

কুরআন ঠিক এই নীতিই দিয়েছে:

ۣالَّذِیۡنَ اُخۡرِجُوۡا مِنۡ دِیَارِہِمۡ بِغَیۡرِ حَقٍّ اِلَّاۤ اَنۡ یَّقُوۡلُوۡا رَبُّنَا اللّٰہُ ؕ وَلَوۡلَا دَفۡعُ اللّٰہِ النَّاسَ بَعۡضَہُمۡ بِبَعۡضٍ لَّہُدِّمَتۡ صَوَامِعُ وَبِیَعٌ وَّصَلَوٰتٌ وَّمَسٰجِدُ یُذۡکَرُ فِیۡہَا اسۡمُ اللّٰہِ کَثِیۡرًا ؕ وَلَیَنۡصُرَنَّ اللّٰہُ مَنۡ یَّنۡصُرُہٗ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَقَوِیٌّ عَزِیۡزٌ
“যাহাদিগকে তাহাদের ঘরবাড়ী হইতে অন্যায়ভাবে শুধু এই কারণে বহিষ্কার করা হইয়াছে যে তাহারা বলে, ‘আল্লাহ্ আমাদের প্রতিপালক’। আল্লাহ্ যদি এই সকল মানুষের একদলকে অন্য দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন, তাহা হইলে সাধু-সন্নাসীগণের মঠ, গির্জা, ইহুদীদের উপাসনালয় এবং মসজিদসমূহ যাহাতে আল্লাহ্‌র নাম অধিক স্মরণ করা হয়, অবশ্যই ধ্বংস করিয়া দেওয়া হইত।…”
সূরা আল-হাজ্জ ২২:৪১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২২:৪০।

শিখ শাসনে পাঞ্জাবের মুসলমানরা ঠিক এমন অবস্থায় ছিলেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, শিখদের হাতে মুসলমানদের দুনিয়া ও দীন দুই-ই বিপন্ন ছিল, এমনকি আযান দেওয়ার জন্য একজনকে হত্যা করা হয়েছিল (১০ জুলাই ১৯০০-এর বিজ্ঞাপন)।

✦

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“সৈয়দ সাহেবের সঙ্গীরা কি অন্যরকম বলেছেন?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, এটি একজন জীবনীকারের কথা মাত্র। চলুন সৈয়দ সাহেবের ঘনিষ্ঠ সঙ্গী মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-এর কথা দেখি। কলকাতায় তাঁর এক ওয়াজের সময় একজন জিজ্ঞেস করলেন, ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ করা কি ঠিক? তিনি উত্তর দিলেন, এমন নিরপেক্ষ ও গোঁড়ামিহীন সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদ জায়েয নয়; অন্যদিকে পাঞ্জাবে শিখদের জুলুম এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ জরুরি (সাওয়ানেহে আহমদী, পৃ. ৫৭)।

স্যার সৈয়দ আহমদ খানও ১৮৮৫ সালে লিখেছেন, মাওলানা মুহাম্মদ ইসমাঈল জিহাদের ডাক দেওয়ার সময় স্পষ্ট বলেছিলেন, ব্রিটিশ সরকারের অধীনে নিরাপদে বসবাসকারী ভারতবাসীর সেই সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদের কোনো কারণ নেই।

“তাহলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নতুন কী বললেন?”

নতুন কিছু নয়, আর এখানেই আপত্তির জবাব। যে নীতিতে ত্রয়োদশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ শিখদের বিরুদ্ধে লড়েছেন আর ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়তে অস্বীকার করেছেন, ঠিক সেই নীতিতেই চতুর্দশ শতাব্দীর মসীহ মওউদ (আ.) বলেছেন, তাঁর দেশে ও যুগে তলোয়ারের জিহাদের শর্ত নেই। পরবর্তী যুগে মাওলানা মওদুদীও লিখেছেন, ব্রিটিশ শাসন প্রতিষ্ঠার পর মুসলমানরা যখন নিজেদের ব্যক্তিগত আইন পালনের স্বাধীনতা নিয়ে এ দেশে বসবাসে সন্তুষ্ট হলেন, তখন এ দেশ আর “যুদ্ধের দেশ” রইল না (সুদ বিষয়ক গ্রন্থ, পৃ. ১)। উদাহরণটি আপত্তিকারীদের পক্ষে নয়, বরং আহমদীয়া অবস্থানের পক্ষেই সবচেয়ে জোরালো সাক্ষ্য।

“ইংরেজরা কি তবে নিখুঁত ছিল?”

সে দাবি কেউ করছে না। প্রশ্নটি শাসকের নিখুঁত হওয়ার নয়, ধর্মের কারণে জুলুম হচ্ছে কি না, তার। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে খ্রিস্টধর্মের মূল বিশ্বাসের বিরুদ্ধে আজীবন লিখেছেন, এবং সরকার তাঁকে কোনো সুবিধা দেয়নি, বরং তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা পর্যন্ত হয়েছে। কিন্তু ধর্ম প্রচারের স্বাধীনতা ছিল, তাই তলোয়ারের জবাব ছিল কলম।

সিদ্ধান্ত: সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.)-এর জিহাদ ছিল ধর্মীয় নির্যাতনকারী শিখ শাসনের বিরুদ্ধে; ইংরেজদের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই জিহাদ অস্বীকার করেছেন। তাই এই উদাহরণ প্রতিশ্রুত মসীহ (আ.)-এর শিক্ষারই সমর্থক।

সংক্ষেপে

  1. সৈয়দ আহমদ বেরলভী (রহ.) শিখদের বিরুদ্ধে লড়েছেন, কারণ তারা মুসলমানদের আযান ও ইবাদতে বাধা দিত।
  2. ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের প্রস্তাব তিনি নিজেই ফিরিয়ে দিয়েছেন, কারণ তারা ধর্মপালনে বাধা দিত না (সাওয়ানেহে আহমদী, পৃ. ৭১)।
  3. মাওলানা ইসমাঈল শহীদ (রহ.)-ও ইংরেজ সরকারের বিরুদ্ধে জিহাদকে জায়েয বলেননি।
  4. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) একই কুরআনী নীতি তুলে ধরেছেন; তাই উদাহরণটি আপত্তিকে নয়, তাঁর অবস্থানকেই প্রমাণ করে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.