১৮৮০-এর দশকের কাদিয়ান। পাঞ্জাবের এক অখ্যাত গ্রাম। গ্রামের এক কোণে এক মানুষ বসে বই লিখছেন, যাঁকে তখন বাইরের খুব কম মানুষই চিনত।
সেই সময় তিনি লিখে প্রকাশ করলেন: দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তোমার কাছে আসবে, এত মানুষ যে পথে গর্ত হয়ে যাবে; উপহার আর সাহায্য আসবে চারদিক থেকে। পঁচিশ বছর পর তিনি হিসাব করতে বসলেন, এই কথাগুলো কতবার সত্য হয়েছে। সেই হিসাব থেকেই এসেছে “দশ লক্ষ” সংখ্যাটি।
আপত্তিটি কী?
আপত্তিতে দুটি উদ্ধৃতি পাশাপাশি রাখা হয়। একটি: “আমার আলামত (নিদর্শন) দশ লক্ষ” (রূহানী খাযায়েন ২১/৭২)। অন্যটি: “রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মু’জিযা তিন হাজার” (রূহানী খাযায়েন ১৭/১৫৩)।
পাঠককে বোঝানো হয়, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেকে নিদর্শনের দিক থেকে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বড় দেখিয়েছেন।
দশ লক্ষ সংখ্যাটি কীভাবে এল?
প্রথম উদ্ধৃতিটি বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডের। সেখানে তিনি প্রথমে বারাহীনে আহমদীয়ার পুরোনো খণ্ডে ছাপা কয়েক লাইনের ভবিষ্যদ্বাণী তুলে ধরেছেন: মানুষ দলে দলে আসবে, তাদের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে, কেউ কেউ ঘরবাড়ি ছেড়ে তাঁর কাছে এসে থাকবে।
তারপর লিখেছেন, এই কয়েক লাইনের ভবিষ্যদ্বাণীতে এত নিদর্শন আছে যে তা দশ লক্ষ ছাড়িয়ে যায়। কীভাবে? তিনি ব্যাখ্যা করেছেন: যখনই কোথাও থেকে টাকা, কাপড় বা উপহার আসে, প্রতিটি একেকটি নিদর্শন, কারণ এগুলোর কথা বলা হয়েছিল এমন সময়ে যখন এমন সাহায্য কল্পনাও করা যেত না। একইভাবে “ইয়া’তূনা মিন কুল্লি ফাজ্জিন আমীক”, অর্থাৎ দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ আসবে। কয়েক লক্ষ মানুষ কাদিয়ানে এসেছে। চিঠিপত্র গুনলে সংখ্যা হয়তো এক কোটি হবে; কিন্তু তিনি শুধু আর্থিক সাহায্য আর বয়আতকারীদের গুনেছেন, তাতেই প্রায় দশ লক্ষ।
অর্থাৎ “দশ লক্ষ নিদর্শন” মানে দশ লক্ষ আলাদা অলৌকিক ঘটনা নয়। একটি ভবিষ্যদ্বাণী যতবার, যত মানুষের মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে, প্রতিটি পূর্ণতাকে তিনি একেকটি সাক্ষ্য হিসেবে গুনেছেন। গণনার পদ্ধতিটি বইয়েই খোলাখুলি লেখা।
সব নিদর্শন কার?
এবার আসল প্রশ্ন। এই নিদর্শনগুলোকে তিনি কার বলে মনে করতেন? হাকীকাতুল ওহীর পরিশিষ্টে (তাতিম্মা) তিনি নিজেই উত্তর দিয়েছেন। তার মর্ম:
“আমাদের নবী (সা.) যত মু’জিযা দেখিয়েছেন, আর কোনো নবী এত দেখাননি, কারণ আগের নবীদের মু’জিযা তাঁদের মৃত্যুর সাথে শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের নবী (সা.)-এর মু’জিযা আজও প্রকাশিত হচ্ছে, কিয়ামত পর্যন্ত প্রকাশিত হতে থাকবে। আমার সমর্থনে যা কিছু প্রকাশিত হয়, সবই মহানবী (সা.)-এর মু’জিযা।”
এর চেয়ে স্পষ্ট কথা আর হয় না। যে দশ লক্ষ নিদর্শনের কথা, তিনি নিজেই সেগুলোকে মহানবী (সা.)-এর হিসাবে জমা করেছেন।
কুরআনের সূত্র: অনুসরণই পথ
কেন এমন? কারণ মহানবী (সা.)-এর পরে আল্লাহর নৈকট্যের পথ একটাই, তাঁর অনুসরণ:
অনুসারী যে আল্লাহর ভালোবাসা আর সাহায্য পায়, তা তার নেতার অনুসরণের ফল। ছাত্রের সাফল্য শিক্ষকের সুনাম বাড়ায়। হাকীকাতুল ওহীতেই তিনি লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর পথ অনুসরণ না করলে এই অনুগ্রহ পাওয়া তাঁর পক্ষে সম্ভব ছিল না।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
দশ লক্ষ আর তিন হাজার: তুলনাটা কি পরিষ্কার নয়?
কেউ কেউ বলেন, সংখ্যাই তো সব বলে দিচ্ছে। কিন্তু দুটি সংখ্যা দুটি ভিন্ন বইয়ের, ভিন্ন আলোচনার, ভিন্ন গণনাপদ্ধতির। দশ লক্ষের গণনায় প্রতিটি আগন্তুক আর প্রতিটি উপহার আলাদা করে গোনা হয়েছে, যা বইয়েই লেখা। এমন দুটি সংখ্যা পাশাপাশি বসিয়ে প্রতিযোগিতা দেখানো ন্যায্য নয়। আর যিনি লিখেছেন “আর কোনো নবী এত মু’জিযা দেখাননি”, তাঁর বিরুদ্ধে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বেশি দাবি করার অভিযোগ টেকে না।
কুরআনেও সংখ্যার উল্লেখ আছে: “এবং আমরা মূসাকে অবশ্যই নয়টি সমুজ্জ্বল নিদর্শন দিয়াছিলাম” (সূরা বনী ইসরাঈল ১৭:১০২)। কেউ কি বলবেন, তাহলে মূসা (আ.)-এর জীবনে নয়টির বেশি নিদর্শন ঘটেনি? সংখ্যা নির্ভর করে কী গোনা হচ্ছে তার ওপর।
মহানবী (সা.)-এর সবচেয়ে বড় মু’জিযা কী?
মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন:
অর্থাৎ মহানবী (সা.)-এর মু’জিযা শুধু তাঁর জীবদ্দশায় সীমাবদ্ধ নয়। কুরআন আর তার প্রভাবে যুগে যুগে যত অনুসারী, যত নিদর্শন, সবই তাঁর মু’জিযার অংশ। হযরত মির্যা সাহেবের দাবিও ঠিক এটাই।
নিজের নিদর্শন গোনা কি অহংকার নয়?
নবী-রসূলরা মানুষের সামনে আল্লাহর নিদর্শন তুলে ধরেন, যেন মানুষ সত্য চিনতে পারে। এটি নিজের প্রশংসা নয়, আল্লাহর সাক্ষ্য দেখানো। বারাহীনে আহমদীয়ার সেই অংশেই তিনি প্রশ্ন রেখেছেন: পঁচিশ বছর আগে যখন তিনি সম্পূর্ণ অখ্যাত ছিলেন, তখন ভবিষ্যতের এমন সাফল্যের খবর দেওয়া কি কোনো মানুষের কাজ হতে পারে?
সব মিলিয়ে: দশ লক্ষ সংখ্যাটি একটি খোলা হিসাব, যার পদ্ধতি বইয়েই লেখা। আর সেই হিসাবের শেষ লাইনে তিনি নিজেই লিখে দিয়েছেন: সব নিদর্শন মহানবী (সা.)-এর। দাসের নিজের বলে কিছু নেই; যা আছে, সব তার মনিবের।
সংক্ষেপে
- “দশ লক্ষ” সংখ্যাটি বারাহীনে আহমদীয়া পঞ্চম খণ্ডের, যেখানে প্রতিটি আগন্তুক ও প্রতিটি সাহায্যকে একেকটি পূর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে গোনা হয়েছে।
- দুটি ভিন্ন বইয়ের দুটি ভিন্ন হিসাব পাশাপাশি বসিয়ে তুলনা করা ন্যায্য নয়।
- হাকীকাতুল ওহীতে তিনি লিখেছেন: আর কোনো নবী মহানবী (সা.)-এর মতো এত মু’জিযা দেখাননি, আর তাঁর সমর্থনে প্রকাশিত সব কিছু মহানবী (সা.)-এর মু’জিযা।
- কুরআন (৩:৩২) অনুযায়ী অনুসারীর সব প্রাপ্তি নেতার অনুসরণের ফল।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Barahin-e-Ahmadiyya Part V · alislam.org
- Haqiqatul-Wahi (English, PDF) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.