“তুমি আমার কাছে আমার সন্তানের মতো”: এই ইলহামের অর্থ কী?

আল্লাহর কোনো সন্তান নেই, এটি ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস। তাহলে এমন শব্দের ইলহাম কেন? উত্তর লুকিয়ে আছে একটি ছোট আরবি শব্দে, “মানযিলা”, আর কুরআনের একটি আয়াতে।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

ধরুন, একজন বয়স্ক শিক্ষক তাঁর প্রিয় ছাত্রকে বললেন, “তুমি তো আমার ছেলের মতো।” কেউ কি এ কথা শুনে ভাববেন যে ছাত্রটি সত্যিই তাঁর ঔরসজাত সন্তান? না। সবাই বোঝেন, এটি স্নেহ আর নৈকট্যের ভাষা।

এই সহজ উদাহরণটি মাথায় রেখে একটি আপত্তির দিকে তাকানো যাক, যা প্রায়ই শোনা যায়।

আপত্তিটি কী

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ইলহামের তালিকায় একটি আরবি বাক্য আছে: “আনতা মিন্নী বিমানযিলাতি ওয়ালাদী”। বিরোধীরা বলেন, এর মানে “তুমি আমার সন্তান”, আর আল্লাহর সন্তান আছে এমন কথা খ্রিস্টানদের বিশ্বাস, ইসলামের নয়। তাই তাঁদের মতে এই ইলহাম শিরকপূর্ণ।

মূল লেখা ও তার সাথেই দেওয়া ব্যাখ্যা

ইলহামটি হকীকাতুল ওহী গ্রন্থে এসেছে (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৮৯)। সেখানে একই ধারায় আরও কয়েকটি বাক্য আছে: “তুমি আমার কাছে আমার তৌহিদ ও একত্বের মতো”, “তুমি আমার কাছে আমার আরশের মতো”, “তুমি আমার কাছে আমার সন্তানের মতো”, আর তার পরেই, “তুমি আমার কাছে এমন নৈকট্যের মর্যাদায় আছ, যা দুনিয়া জানে না।”

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজে এর উর্দু অর্থ লিখেছেন: “তু মুঝ সে বমনযিলা মেরে ফরযন্দ কে হ্যায়”, অর্থাৎ তুমি আমার কাছে আমার সন্তানের মর্যাদায়। আর একই পৃষ্ঠার পাদটীকায় তিনি স্পষ্ট লিখে দিয়েছেন:

“আল্লাহ তায়ালা পুত্র-সন্তান থেকে পবিত্র। এই বাক্য রূপক অর্থে এসেছে। যেহেতু এ যুগে অজ্ঞ খ্রিস্টানরা এমন শব্দের ভিত্তিতে হযরত ঈসা (আ.)-কে খোদা বানিয়ে রেখেছে, তাই আল্লাহর প্রজ্ঞা চেয়েছে এই অধমের জন্য তার চেয়েও জোরালো শব্দ ব্যবহার করতে, যাতে খ্রিস্টানদের চোখ খোলে এবং তারা বোঝে, যে শব্দের ভিত্তিতে তারা মসীহকে খোদা বানায়, এই উম্মতেও এমন একজন আছেন যাঁর সম্পর্কে তার চেয়েও জোরালো শব্দ এসেছে।”

অর্থাৎ যিনি ইলহামটি প্রকাশ করেছেন, তিনিই একই জায়গায় জানিয়ে দিয়েছেন: এটি রূপক, আর আল্লাহর সন্তান থাকার ধারণা তিনি সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করেন। এই পাদটীকা বাদ দিয়ে শুধু ইলহামের বাক্যটি দেখানো ন্যায়সঙ্গত নয়।

“মানযিলা” শব্দটির অর্থ

ইলহামে শুধু “তুমি আমার সন্তান” বলা হয়নি। বলা হয়েছে “বিমানযিলাতি ওয়ালাদী”, অর্থাৎ সন্তানের মানযিলা বা মর্যাদায়, সন্তানের মতো। আরবিতে “মানযিলা” মানে অবস্থান, মর্যাদা। কোনো কিছুর “মানযিলায়” থাকা মানে সেটি হয়ে যাওয়া নয়, তার মতো সম্পর্কের স্থানে থাকা।

এই একই গঠন মহানবী (সা.)-এর মুখেও আছে। তিনি হযরত আলী (রা.)-কে বলেছিলেন: “আমা তারদা আন তাকূনা মিন্নী বিমানযিলাতি হারূনা মিন মূসা”, “তুমি কি এতে সন্তুষ্ট নও যে, তুমি আমার কাছে তেমন, যেমন মূসার কাছে হারূন ছিলেন?” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৭০৬)। হযরত আলী (রা.) হযরত হারূন (আ.) হয়ে যাননি, হযরত মূসা (আ.)-এর ভাইও ছিলেন না। “মানযিলা” শুধু সম্পর্কের ধরনটি বোঝায়। ইলহামের ভাষাও ঠিক এই রকম।

✦

কুরআনের একটি আয়াত

হজের বিধান বলার পর কুরআন মুসলমানদের বলছে:

فَاذۡکُرُوا اللّٰہَ کَذِکۡرِکُمۡ اٰبَآءَکُمۡ اَوۡ اَشَدَّ ذِکۡرًا
“…তখন তোমরা আল্লাহ্‌কে স্মরণ কর তোমাদের পিতৃপুরুষদিগকে স্মরণ করার ন্যায়, অথবা তদপেক্ষা অধিকতর স্মরণ কর…”
সূরা আল-বাকারা ২:২০১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:২০০।

একটি শিশু যেভাবে বাবাকে মনে রাখে, ভালোবাসায়, ভরসায়, বারবার, আল্লাহকে সেভাবে বা তার চেয়েও বেশি মনে রাখতে বলা হয়েছে। এখানে আল্লাহ বাবা আর বান্দা সন্তান, এমন কেউ বোঝেন না। এটি ভালোবাসার সম্পর্ক বোঝানোর একটি উপমা।

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঠিক এই আয়াতটি দিয়েই ইলহামের ব্যাখ্যা করেছেন। আল-ইস্তিফতা-র আরবি পাদটীকায় তিনি লিখেছেন: আল্লাহ সন্তান থাকা থেকে পবিত্র ও মহান; তবে এটি একটি রূপক, যেমন আল্লাহর বাণী, “তোমরা আল্লাহকে স্মরণ কর যেমন তোমাদের পিতৃপুরুষদের স্মরণ কর”; কুরআনে এমন রূপক অনেক আছে, আর জ্ঞানী ও আধ্যাত্মিক মানুষদের কাছে এতে কোনো আপত্তির কারণ নেই; সূফিদের কথাতেও এর দৃষ্টান্ত পাওয়া যায় (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৭০৯)।

তাতিম্মা হকীকাতুল ওহী-তেও তিনি লিখেছেন, যারা নিজেদের আল্লাহর মধ্যে বিলীন করে দেয়, তাদের রূপক অর্থে “আল্লাহর সন্তান” বলা হয়, কারণ তারা নিষ্পাপ শিশুর মতো গভীর আবেগে আল্লাহকে স্মরণ করে; এর অর্থ এই নয় যে তারা সত্যিই আল্লাহর সন্তান, এমন বলা কুফর, কারণ আল্লাহ সন্তান থেকে পবিত্র (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৫৮১-৫৮২)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

রূপক হলেও আল্লাহ কি এমন শব্দ ব্যবহার করতে পারেন?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর মর্যাদার কথা ভেবে এমন শব্দ রূপক হিসেবেও আসা উচিত নয়। কিন্তু সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে কুদসীতে আল্লাহ বলেন, বান্দা নফল ইবাদতের মাধ্যমে তাঁর এত কাছে আসে যে, “আমি তার কান হয়ে যাই যা দিয়ে সে শোনে, তার চোখ হয়ে যাই যা দিয়ে সে দেখে, তার হাত হয়ে যাই যা দিয়ে সে ধরে” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৫০২)। কোনো মুসলমান এর অর্থ এই করেন না যে আল্লাহ সত্যিই মানুষের কান-চোখ হয়ে যান। সবাই বোঝেন, এটি গভীর নৈকট্যের ভাষা। যে ভাষা হাদীসে গ্রহণযোগ্য, একই রীতির ভাষা ইলহামে এলে তা হঠাৎ শিরক হয়ে যায় না।

খ্রিস্টানরাও তো বলে “ঈশ্বরের পুত্র” রূপক, তাহলে পার্থক্য কোথায়?

পার্থক্যটি বিশ্বাসে। খ্রিস্টানরা ঈসা (আ.)-কে সত্যিই ঈশ্বরের পুত্র ও উপাস্য মানে। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এর বিপরীতে লিখেছেন, আল্লাহ সন্তান থেকে পবিত্র, আর এই শব্দ শুধু রূপক। কুরআন যা বলে, তিনিও তাই বলেছেন:

لَمۡ یَلِدۡ ۬ۙ وَلَمۡ یُوۡلَدۡ
“তিনি কাহাকেও জন্ম দেন নাই এবং তাঁহাকেও জন্ম দেওয়া হয় নাই;”
সূরা আল-ইখলাস ১১২:৪

বরং তাঁর ব্যাখ্যা অনুযায়ী, এই ইলহামের উদ্দেশ্যই ছিল খ্রিস্টানদের যুক্তি ভেঙে দেওয়া: যে ধরনের শব্দ দিয়ে তারা ঈসা (আ.)-কে খোদা বানায়, তার চেয়েও জোরালো শব্দ মহানবী (সা.)-এর একজন উম্মতের জন্য এসেছে, অথচ তিনি মানুষই। তাহলে এমন শব্দ দিয়ে কাউকে খোদা বানানোর যুক্তি টেকে না।

সংক্ষেপে

  1. ইলহামের শব্দ “বিমানযিলাতি ওয়ালাদী”, অর্থাৎ সন্তানের মর্যাদায় বা সন্তানের মতো; “মানযিলা” মানে মর্যাদা ও অবস্থান।
  2. একই পৃষ্ঠার পাদটীকায় লেখা আছে: আল্লাহ সন্তান থেকে পবিত্র, এটি রূপক (হকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৮৯)।
  3. মহানবী (সা.) হযরত আলী (রা.)-কে বলেছিলেন, “তুমি আমার কাছে মূসার কাছে হারূনের মর্যাদায়” (বুখারী ৩৭০৬); একই ভাষারীতি।
  4. কুরআন বলে, আল্লাহকে স্মরণ কর যেমন পিতৃপুরুষদের স্মরণ কর (২:২০১); এই আয়াত দিয়েই তিনি ইলহামের ব্যাখ্যা করেছেন (রূহানী খাযায়েন ২২, পৃ. ৭০৯)।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.