শ্রীনগরের পুরোনো শহর। সরু গলি, কাঠের বারান্দা, আর খানইয়ার মহল্লায় ছোট্ট একটি সমাধিঘর। স্থানীয় মানুষ একে বলে “রওজাবল”। ভেতরে শুয়ে আছেন এক বিদেশি নবী, যাঁকে তারা চেনে “ইউয আসফ” নামে।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঘোষণা করেছিলেন, এই কবরটিই হযরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.)-এর আসল কবর। কিন্তু বিরোধীরা তাঁর আরেকটি লেখা সামনে আনেন, যেখানে গালীলের কথা আছে। তাহলে কোনটি ঠিক?
আপত্তিটি কী?
আপত্তিটি এমন: তিনি ইযালায়ে আওহাম গ্রন্থে লিখেছেন, “একথা সত্য, মসীহ তাঁর দেশ গালীলে গিয়ে মারা গেছেন” (রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৩)। আবার পরে লিখেছেন, মসীহ কাশ্মীরে এসে মৃত্যুবরণ করেছেন এবং শ্রীনগরের খানইয়ার মহল্লায় তাঁর কবর আছে। কোথাও আবার “বিলাদে শাম” (সিরিয়া-ফিলিস্তিন অঞ্চল)-এ কবরের কথাও এসেছে। বিরোধীরা বলেন, এক মানুষের কবর তিন জায়গায় হয় কী করে?
প্রশ্নটি ন্যায্য। উত্তর পেতে হলে বাক্যটিকে তার আগে-পিছের লেখাসহ পড়তে হবে।
গালীলের বাক্যটি কোন প্রসঙ্গে?
ইযালায়ে আওহাম-এর ওই অংশটি আসলে একটি খ্রিস্টান পত্রিকার জবাব। পত্রিকাটি দাবি করেছিল, এগারোজন শিষ্য নিজের চোখে যিশুকে আকাশে উঠে যেতে দেখেছেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেই দাবিটিই বাইবেলের বর্ণনা দিয়ে পরীক্ষা করছিলেন।
তিনি দেখালেন, আকাশে ওঠার বর্ণনাটি লূকের, যিনি যিশুকে কখনো দেখেননি। এরপর তিনি বললেন, এই বর্ণনাগুলোকেই যদি মেনে নেওয়া হয়, তাহলেও তা থেকে সশরীরে আকাশে ওঠা প্রমাণ হয় না; বরং মসীহ তাঁর নিজের দেশ গালীলে গিয়ে স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন বলেই বোঝা যায়।
আর এই আলোচনার শেষে তিনি নিজেই সতর্ক করে দিয়েছেন:
“মনে রাখবে, এসব বিশ্লেষণ এমন অবস্থায়, যখন আমরা এসব উদ্ধৃতিকে সঠিক ও হস্তক্ষেপমুক্ত বলে মেনে নিই; কিন্তু এসব উদ্ধৃতি মেনে নেওয়া কঠিন বিষয়।” (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৫৩–৩৫৬)
অর্থাৎ গালীলের কথাটি ছিল খ্রিস্টানদের নিজেদের বইয়ের ভিত্তিতে একটি যুক্তি: “তোমাদের বই মানলেও তোমাদের দাবি টেকে না।” এটি তাঁর চূড়ান্ত গবেষণার ফল হিসেবে লেখা হয়নি।
একই জায়গায় তিনি এটিও পরিষ্কার করেছেন যে মসীহ ক্রুশে মারা যাননি, আল্লাহ তাঁর প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। এই মূল কথাটি তাঁর সব লেখায় এক।
তিনি নিজেই বিষয়টি পরিষ্কার করে গেছেন
সবচেয়ে বড় কথা, এই “স্ববিরোধ”-এর উত্তর তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন। সত বচন গ্রন্থে তিনি লিখেছেন:
“হ্যাঁ, আমি কোনো এক পুস্তকে এটিও লিখেছিলাম যে হযরত মসীহর কবর বিলাদে শামে; কিন্তু এখন সঠিক গবেষণা আমাদের এ কথা লিখতে বাধ্য করছে যে প্রকৃত কবর কাশ্মীরেই আছে, আর বিলাদে শামের কবরটি হলো সেই জায়গা, যেখানে তাঁকে জীবিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং যেখান থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন।” (সত বচন, রূহানী খাযায়েন, ১০ম খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩০৭)
এখন ছবিটি পরিষ্কার। দুটি আলাদা জিনিসকে “কবর” বলা হচ্ছে।
প্রথমটি ফিলিস্তিনের সেই পাথর কাটা কক্ষ, যেখানে ক্রুশ থেকে নামানোর পর অচেতন ঈসা (আ.)-কে রাখা হয়েছিল। খ্রিস্টানরা আজও সেটিকে “যিশুর কবর” বলে সম্মান করে। কিন্তু তিনি সেখান থেকে জীবিত বেরিয়ে এসেছিলেন। আলইসলাম ডট অর্গও একই কথা লেখে: তাঁকে অচেতন অবস্থায় ক্রুশ থেকে নামানো হয়, কবরে রাখা হয়, আর সেখানে তিনি সুস্থ হয়ে ওঠেন।
দ্বিতীয়টি তাঁর আসল সমাধি, যেখানে স্বাভাবিক মৃত্যুর পর তাঁকে দাফন করা হয়েছে: শ্রীনগরের খানইয়ার মহল্লার রওজাবল।
একটি “কবর” থেকে তিনি বেরিয়ে এসেছিলেন; অন্যটিতে তিনি চিরনিদ্রায় শুয়ে আছেন। এখানে কোনো বিরোধ নেই।
কুরআন কী ইঙ্গিত দেয়?
পবিত্র কুরআন ঈসা (আ.) ও তাঁর মায়ের এক বিশেষ আশ্রয়ের কথা বলে:
“আশ্রয় দেওয়া” কথাটি সাধারণত বিপদ পার হওয়ার পরের নিরাপত্তা বোঝায়। আর পাহাড়ঘেরা, ঝরনায় ভরা, উঁচু উপত্যকা: কাশ্মীরের বর্ণনা এর চেয়ে সুন্দর করে আর কী হতে পারে? আহমদীয়া মুসলিম জামাত এই আয়াতকে ক্রুশের ঘটনার পর ঈসা (আ.)-এর পূর্বদিকে হিজরতের দিকে ইঙ্গিত হিসেবে দেখে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মত বদলানো কি নবীর মর্যাদার সঙ্গে মেলে?
কেউ কেউ বলেন, যিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার দাবি করেন, তাঁর লেখায় একটি তথ্য বদলায় কী করে? চলুন দেখি তিনি নিজে কী বলেছেন। হাকীকাতুল ওহী-তে তিনি অকপটে লিখেছেন, ওহী যতক্ষণ কোনো বিষয় খুলে না বলে, ততক্ষণ তিনি প্রচলিত ধারণার ওপরই থাকেন; পরে জ্ঞান এলে কথা বদলান। তাঁর ভাষায়: “আমি একজন মানুষ মাত্র; আমি অদৃশ্যের জ্ঞানী হওয়ার দাবি করি না।” (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৪৮–১৫০; আলইসলামের Truth Prevails গ্রন্থে উদ্ধৃত)
নবীরাও মানুষ। আল্লাহ যা জানান, তাঁরা তা-ই জানেন। নতুন জ্ঞান পেয়ে আগের ধারণা সংশোধন করা সততার লক্ষণ, স্ববিরোধ নয়।
গালীলের কথাটি কি তাহলে ভুল ছিল?
বাক্যটি ছিল শর্তযুক্ত: “যদি তোমাদের বর্ণনাগুলো সঠিক বলে মানি।” তিনি স্পষ্ট লিখেছেন যে ওই বর্ণনাগুলো মেনে নেওয়াই কঠিন। শর্তযুক্ত যুক্তিকে চূড়ান্ত দাবি বলে চালানো ন্যায্য নয়। কেউ যদি বলে, “তোমার হিসাব মানলেও তুমি হারছ,” তার মানে এই নয় যে সে তোমার হিসাবকে সঠিক বলছে।
কাশ্মীরের কবরই যে ঈসা (আ.)-এর, তার ভিত্তি কী?
এর ভিত্তি কয়েক স্তরের। কুরআন বলে, ঈসা (আ.) ক্রুশে মারা যাননি এবং আল্লাহ তাঁকে ও তাঁর মাকে এক ঝরনাময় উচ্চভূমিতে আশ্রয় দিয়েছিলেন। আলইসলাম ডট অর্গ জানায়, তিনি বনী ইসরাঈলের হারানো দশ গোত্রের কাছে বাণী পৌঁছাতে পূর্বদিকে যাত্রা করেন, যারা আফগানিস্তান ও কাশ্মীরে বসতি গড়েছিল। আর খানইয়ারের সমাধিটি স্থানীয়ভাবে বহু শতাব্দী ধরে এক বিদেশি নবীর কবর হিসেবেই পরিচিত।
সংক্ষেপে
- গালীলের কথাটি খ্রিস্টানদের নিজেদের বর্ণনা মেনে নিয়ে দেওয়া একটি শর্তযুক্ত যুক্তি, তাঁর চূড়ান্ত গবেষণা নয়।
- ফিলিস্তিনের “কবর” হলো সেই কক্ষ, যেখানে ক্রুশের পর তাঁকে জীবিত অবস্থায় রাখা হয়েছিল এবং যেখান থেকে তিনি বেরিয়ে আসেন।
- হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই সত বচন-এ লিখে গেছেন: প্রকৃত কবর কাশ্মীরে।
- নতুন জ্ঞান পেয়ে আগের ধারণা সংশোধন করা স্ববিরোধ নয়; তাই এই আপত্তির কোনো ভিত্তি থাকে না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Jesus Son of Mary · alislam.org
- Truth Prevails, Chapter III · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.