একজন তরুণ বন্ধুর কাছ থেকে একটি কুরআন ধার নিলেন। প্রচ্ছদে লেখা, আহমদীয়া মুসলিম জামাত কর্তৃক প্রকাশিত। খতিবের মুখে শোনা একটি আয়াত মিলিয়ে দেখতে গিয়ে তিনি থমকে গেলেন: আয়াতটি যেখানে থাকার কথা, সেখানে নেই, আছে পরের নম্বরে। মনে খটকা লাগল, তাহলে কি এটা অন্য কুরআন?
এই খটকাটি খুব স্বাভাবিক। আর এর উত্তরও খুব সহজ, যদি আমরা তিনটি আলাদা জিনিসকে আলাদা করে দেখি: আরবি পাঠ, আয়াতের নম্বর, আর অনুবাদ।
আপত্তিটি কী?
বলা হয়, আহমদী মুসলমানদের কুরআন মুসলমানদের কুরআন থেকে আলাদা; আয়াতের সংখ্যা ভিন্ন, আর তাদের অনুবাদ বিকৃত, যাতে নিজেদের বিশ্বাসের পক্ষে অর্থ বসানো হয়েছে।
আরবি পাঠ: একটি অক্ষরও আলাদা নয়
আহমদীয়া মুসলিম জামাত যে কুরআন ছাপে, তাতে সেই একই ১১৪টি সূরা, একই ক্রমে, একই আরবি শব্দে, প্রথম সূরা আল-ফাতিহা থেকে শেষ সূরা আন-নাস পর্যন্ত। যে কেউ যেকোনো পৃষ্ঠা খুলে নিজের ঘরের কুরআনের সাথে মিলিয়ে দেখতে পারেন। এটি বিশ্বাসের প্রশ্ন নয়, চোখে দেখে যাচাই করার বিষয়।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজের বিশ্বাস লিখে গেছেন: কুরআন সব ঐশী গ্রন্থের মোহর; এর শিক্ষা থেকে একটি বিন্দুও বাড়ানো বা কমানো যায় না; আর যে এর কোনো বিধান বদলানোর বিশ্বাস রাখে, সে মুমিনদের দল থেকে বেরিয়ে যায়। (ইযালায়ে আওহাম, রূহানী খাযায়েন, ৩য় খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৭০) কুরআনের হেফাজতের দায়িত্ব আল্লাহ নিজে নিয়েছেন:
লক্ষ করুন, ঠিক এই আয়াতটির নম্বরেই আমাদের প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে আছে: এক গণনায় ১৫:১০, অন্য গণনায় ১৫:৯। আয়াত একই, শব্দ একই, শুধু নম্বর আলাদা। কেন?
আয়াতের নম্বর: বিসমিল্লাহর হিসাব
প্রতিটি সূরার শুরুতে (সূরা আত-তওবা ছাড়া) আছে “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম”। এটি কুরআনের অংশ, এ নিয়ে কোনো মতভেদ নেই; প্রশ্ন শুধু এটিকে আলাদা আয়াত হিসেবে গোনা হবে কি না।
মজার বিষয়, প্রচলিত মুসহাফও সূরা আল-ফাতিহায় বিসমিল্লাহকে প্রথম আয়াত হিসেবে গোনে। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের কুরআন এই একই নিয়ম প্রতিটি সূরায় প্রয়োগ করে। ফলে সূরা ফাতিহা আর সূরা তওবা ছাড়া বাকি সব সূরায় আয়াতের নম্বর প্রচলিত গণনার চেয়ে এক বেশি হয়। এই সাইটের প্রতিটি আয়াতের নিচে তাই দুই গণনাই লিখে দেওয়া থাকে।
বিসমিল্লাহ যে প্রতিটি সূরার সাথে নাযিল হতো, হাদীসে তার সাক্ষ্য আছে:
আর হযরত আনাস (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) বললেন, এইমাত্র আমার ওপর একটি সূরা নাযিল হয়েছে, তারপর তিনি “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম” দিয়ে শুরু করে সূরা আল-কাওসার পড়লেন। (সহীহ মুসলিম, কিতাবুস সালাত, হাদীস ৪০০) নাযিল হওয়া একটি বাক্যকে আয়াত হিসেবে গোনা, এটুকুই আহমদীয়া গণনার ভিত্তি। আয়াত গণনার পার্থক্য নতুন কিছুও নয়; কুফা, বসরা, মদীনার প্রাচীন আলেমরাও আয়াতের মোট সংখ্যা ভিন্ন ভিন্নভাবে গুনেছেন, অথচ কুরআন সবার এক।
অনুবাদ: সব অনুবাদই ব্যাখ্যা
আরবি থেকে বাংলায় আনতে গেলে প্রতিটি অনুবাদককে শব্দ বেছে নিতে হয়, আর সেই বাছাইয়ে তাঁর বোঝাপড়া প্রতিফলিত হয়। বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন বাংলা অনুবাদ পাশাপাশি রাখলেই দেখা যায়, একই আয়াতের অনুবাদ ভিন্ন ভিন্ন। এ কারণেই আলেমরা বলেন, অনুবাদ কুরআন নয়, কুরআনের অর্থের একটি প্রকাশ।
একটি উদাহরণ দেখা যাক। সূরা আল-মায়েদার একটি আয়াতে কিয়ামতের দিন ঈসা (আ.) আল্লাহকে বলবেন:
কোনো কোনো অনুবাদে “তাওয়াফফাইতানী” শব্দটির অনুবাদ করা হয় “তুমি আমাকে তুলে নিলে”। আহমদীয়া অনুবাদে আছে “তুমি আমাকে মৃত্যু দিলে”। কোনটি ঠিক? সহীহ বুখারীতে মহানবী (সা.) কিয়ামতের দিনের কথা বলতে গিয়ে নিজের সম্পর্কে হুবহু এই বাক্যটিই ব্যবহার করেছেন: “আমি তখন সেই নেক বান্দার মতো বলব, ‘…ফালাম্মা তাওয়াফফাইতানী…’” (সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাফসীর, হাদীস ৪৬২৫) মহানবী (সা.)-এর ক্ষেত্রে এর অর্থ যে মৃত্যু, তা সবাই মানেন। আহমদীয়া অনুবাদ এখানে সেই অর্থই নিয়েছে। আপনি একমত হন বা না হন, এটি একটি যুক্তিনির্ভর ব্যাখ্যা, কুরআনের বিকৃতি নয়।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আয়াতের নম্বর বদলানো কি কুরআনে হস্তক্ষেপ নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, নম্বর বদলানোই একরকম পরিবর্তন। চলুন দেখি। আয়াতের নম্বর কুরআনের নাযিল হওয়া পাঠের অংশ নয়; প্রাচীন হাতে লেখা মুসহাফগুলোতে আয়াতের নম্বরই ছিল না, পরে পাঠকের সুবিধার জন্য তা যোগ হয়েছে। আর আগেই বলেছি, প্রচলিত মুসহাফও সূরা ফাতিহায় বিসমিল্লাহকে আয়াত গোনে। যে নিয়ম একটি সূরায় সবার কাছে গ্রহণযোগ্য, তা সব সূরায় প্রয়োগ করলে কুরআন বদলায় না।
তাদের অনুবাদে কি নিজেদের মত ঢোকানো হয়নি?
প্রত্যেক অনুবাদকই নিজের বোঝাপড়া অনুযায়ী শব্দ বাছেন; তাই প্রশ্নটি সব অনুবাদের জন্যই প্রযোজ্য। যেমন সূরা আল-আহযাবে মহানবী (সা.)-কে বলা হয়েছে “খাতামান নাবিয়্যীন”। আহমদীয়া অনুবাদে লেখা আছে “নবীগণের মোহর” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১), যা শব্দটির আভিধানিক অর্থ। এর ব্যাখ্যা নিয়ে আলোচনা হতে পারে, কিন্তু মূল আরবি শব্দটি সবার সামনে অক্ষত। কুরআন নিজেই সবাইকে চিন্তা করতে ডাকে:
আরবি পাঠ যেখানে এক, সেখানে মতভেদ হয় ব্যাখ্যায়, আর ব্যাখ্যার বিচার হয় যুক্তি, হাদীস ও আরবি ভাষার নিয়মে।
তাহলে আলাদা প্রকাশনার দরকার কী?
আহমদীয়া মুসলিম জামাত বহু ভাষায় কুরআনের অনুবাদ প্রকাশ করেছে, যার অনেকগুলো এমন ভাষায়, যেখানে আগে কোনো অনুবাদই ছিল না। উদ্দেশ্য একটাই: আরবি কুরআনের সাথে মানুষের নিজের ভাষায় তার অর্থ পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি ছাপায় মূল আরবি পাঠ পাশে রাখা হয়, যেন পাঠক যেকোনো সময় মিলিয়ে নিতে পারেন।
সংক্ষেপে
- আহমদীয়া মুসলিম জামাতের ছাপা কুরআনে আরবি পাঠ, সূরার সংখ্যা ও ক্রম হুবহু একই; যে কেউ মিলিয়ে দেখতে পারেন।
- নম্বরের পার্থক্য আসে বিসমিল্লাহকে প্রতিটি সূরার প্রথম আয়াত গোনার কারণে; প্রচলিত মুসহাফও সূরা ফাতিহায় এটি করে।
- হাদীসে আছে, প্রতিটি সূরার সাথে বিসমিল্লাহ নাযিল হতো; নাযিল হওয়া বাক্যকে আয়াত গোনাই এই গণনার ভিত্তি।
- সব অনুবাদই ব্যাখ্যা; আহমদীয়া অনুবাদের পছন্দগুলো আরবি ভাষা ও হাদীসের যুক্তিতে দাঁড়ানো, কুরআনের পাঠে কোনো পরিবর্তন নেই।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Why is Bismillahir Rahmanir Raheem counted as the first verse? · alislam.org
- Our Kalima (Creed) has Never Changed · reviewofreligions.org
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.