উনিশ শতকের শেষভাগ। ভারতবর্ষে ছাপাখানা তখন নতুন অস্ত্র। খ্রিস্টান মিশনারিরা লাখ লাখ পুস্তিকা ছাপছে, আর্য সমাজের প্রচারকরা ইসলাম ও মহানবী (সা.)-কে আক্রমণ করে বই লিখছে। মুসলমানদের পক্ষ থেকে জবাব প্রায় নেই।
এমন সময়ে কাদিয়ানের এক নিভৃতচারী মানুষ কলম হাতে নিলেন। আলইসলাম ডট অর্গ লেখে, এই পরিস্থিতিতেই হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইসলামের সত্যতা ও কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য কলম তুলে নেন। পরে তিনি আশিটিরও বেশি বই লেখেন, বেশিরভাগ উর্দু, আরবি ও ফারসিতে।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, কোনো নবী বই-পুস্তক লেখেননি। মির্যা সাহেব বই লিখেছেন, তাই তিনি নবী হতে পারেন না।
এই মাপকাঠি কোথায় আছে?
প্রথম কথা: কুরআনের কোনো আয়াত বা কোনো হাদীস বলেনি যে নবী বই লিখতে পারবেন না। সত্য যাচাইয়ের মাপকাঠি আল্লাহ ও তাঁর রসূল দেন; নিজের পক্ষ থেকে নতুন মাপকাঠি বানানো যায় না।
দ্বিতীয় কথা: প্রতিটি নবীর কাজ ও নিদর্শন তাঁর যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা। হযরত নূহ (আ.) নৌকা বানিয়েছিলেন, অন্য কোনো নবী বানাননি। তাহলে কি বলা হবে, নৌকা বানানো নবীর কাজ নয়? হযরত মূসা (আ.)-কে আল্লাহ লিখিত ফলক দিয়েছিলেন:
লেখা আর পাঠ্য নবুওয়তের ইতিহাসের অংশ। আর কুরআনের সর্বপ্রথম নাযিলকৃত আয়াতগুলোর মধ্যেই আল্লাহ নিজের পরিচয় দিয়েছেন এভাবে:
শেষ যুগের নিদর্শন: বইয়ের বিস্তার
কুরআন শেষ যুগের একটি চিহ্নের কথা বলেছে:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) শিয়ালকোটের বক্তৃতায় বলেছেন, আল্লাহ কুরআনে জানিয়েছেন যে শেষ যুগে খাল কাটা হবে, বই ও পত্রিকা ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হবে, উট অব্যবহৃত হয়ে পড়বে; আর এসব আমাদের যুগে পূর্ণ হয়েছে। (লেকচার শিয়ালকোট)
যে যুগের পরিচয় ছাপাখানা আর বইয়ের বিস্তার, সেই যুগের সংস্কারকের হাতিয়ার কী হবে? তলোয়ার নয়, কলম। আলইসলাম ডট অর্গ যেমন লেখে: তিনি বারবার বলেছেন, তাঁর সংগ্রাম তলোয়ারের নয়, কলমের।
তাঁর প্রথম বড় বই বারাহীনে আহমদীয়া লেখার কারণ তিনি নিজেই বলেছেন: ইসলামের সত্যতা, কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব আর খাতামান্নাবিয়্যীন মহানবী (সা.)-এর নবুওয়তের সত্যতার প্রমাণ মানুষের সামনে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা, যাতে যারা এই পবিত্র কিতাব ও নবীকে মানে না, তারা বুদ্ধিভিত্তিক প্রমাণের সামনে নিরুত্তর হয়। এই বইয়ের প্রমাণ খণ্ডনকারীর জন্য তিনি দশ হাজার রুপি পুরস্কারও ঘোষণা করেছিলেন। কেউ সেই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে সফল হয়নি।
শুধু বই নয়; আলইসলাম ডট অর্গ জানায়, তিনি অসংখ্য বিতর্কে অংশ নিয়েছেন এবং বহু ইশতেহার প্রকাশ করেছেন। এক কথায়, তাঁর যুগের প্রতিটি আধুনিক মাধ্যম তিনি ব্যবহার করেছেন একটি লক্ষ্যে: ইসলামকে সব ধর্মের ওপর বিজয়ী করে দেখানো।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মহানবী (সা.) তো উম্মী ছিলেন, লিখতে-পড়তে জানতেন না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, শ্রেষ্ঠ নবী যেহেতু লেখেননি, তাই লেখা নবীর কাজ নয়। চলুন দেখি। মহানবী (সা.)-এর উম্মী হওয়া ছিল তাঁর বিশেষ মর্যাদার নিদর্শন, যাতে কেউ বলতে না পারে কুরআন তিনি বই পড়ে রচনা করেছেন। কিন্তু তিনিও লেখার মাধ্যম ব্যবহার করেছেন। রোম সম্রাট হিরাক্লিয়াসের কাছে তাঁর চিঠি পৌঁছেছিল, যা শুরু হয়েছিল এভাবে: “বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম। আল্লাহর বান্দা ও তাঁর রসূল মুহাম্মদের পক্ষ থেকে রোমের প্রধান হিরাক্লিয়াসের প্রতি… আমি আপনাকে ইসলামের দাওয়াত দিচ্ছি; ইসলাম গ্রহণ করুন, নিরাপদ থাকবেন।” (সহীহ বুখারী, কিতাবু বাদইল ওহী, হাদীস ৭) লিখে বাণী পৌঁছানো নবীর সুন্নত।
অন্য নবীরা কি লিখতে জানতেন?
মহানবী (সা.)-এর উম্মী হওয়াকে কুরআন তাঁর বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। এর মানে এই নয় যে সব নবী নিরক্ষর ছিলেন। মূসা (আ.)-এর লিখিত ফলকের কথা কুরআনেই আছে। আসল প্রশ্ন হলো, নবী কী বলেন ও কী লেখেন: তা আল্লাহর দিকে ডাকে কি না, ইসলামকে শক্তিশালী করে কি না।
বিরোধীরা কি অতীতের নবীদের বিরুদ্ধেও এমন আপত্তি করেছিল?
করেছিল। মহানবী (সা.)-এর বিরোধীরা বলেছিল:
নিজেদের মনগড়া ছবির সঙ্গে না মিললে মানুষ সব যুগেই নবীকে প্রত্যাখ্যান করেছে। খাওয়া বা বাজারে যাওয়া যেমন নবুওয়তের বিরুদ্ধে প্রমাণ নয়, বই লেখাও নয়। বরং এক হাতে আশিটিরও বেশি বই লিখে ইসলামের পক্ষে যুক্তির পাহাড় দাঁড় করানো তাঁর পক্ষে একটি নিদর্শন।
বই লেখার পেছনে কি খ্যাতি বা উপার্জনের উদ্দেশ্য ছিল?
তাঁর বইগুলোর ইতিহাসই উত্তর দেয়। বারাহীনে আহমদীয়া-র প্রমাণ খণ্ডনের জন্য তিনি নিজের পক্ষ থেকে দশ হাজার রুপি পুরস্কার ঘোষণা করেছিলেন। পরে খ্রিস্টান হয়ে যাওয়া এক ব্যক্তি, ইমাদুদ্দীন, যখন মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে অত্যন্ত আপত্তিকর একটি বই লেখেন, তখন তিনি আরবিতে নূরুল হক লেখেন এবং চ্যালেঞ্জ দেন, দুই মাসের মধ্যে কেউ এর সমমানের আরবি গদ্য-পদ্য লিখে দেখালে তাকে পাঁচ হাজার রুপি দেওয়া হবে। (আলইসলাম ডট অর্গ, Introducing the Books of the Promised Messiah) যে লেখক নিজের পকেট থেকে পুরস্কার ঘোষণা করে প্রতিপক্ষকে আহ্বান জানান, তাঁর লক্ষ্য উপার্জন নয়, ইসলামের পক্ষে প্রমাণ দাঁড় করানো।
সংক্ষেপে
- কুরআন বা হাদীসে কোথাও বলা নেই যে নবী বই লিখতে পারবেন না; এটি একটি মনগড়া মাপকাঠি।
- প্রতিটি নবীর কাজ যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী; নূহ (আ.)-এর নৌকা, মূসা (আ.)-এর লিখিত ফলক তার উদাহরণ।
- কুরআন শেষ যুগে বই-পুস্তিকার ব্যাপক বিস্তারের কথা বলেছে; সেই যুগের মসীহের হাতিয়ার কলম।
- মহানবী (সা.) নিজেও চিঠি লিখিয়ে দাওয়াত দিয়েছেন; তাই বই লেখা নবুওয়তের বিরোধী নয়, বরং তাঁর সত্যতার একটি চিহ্ন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Introducing the Books of the Promised Messiah (as) · alislam.org
- Lecture Sialkot · alislam.org
- Selected Poems of the Promised Messiah · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.