১৮৯৩ সালের গ্রীষ্মকাল, অমৃতসর। এক খ্রিস্টান মিশনারির বাড়িতে প্রতিদিন ভিড় জমছে। একদিকে মুসলমানদের পক্ষে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.), অন্যদিকে খ্রিস্টানদের পক্ষে অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আথম। ২২ মে থেকে ৫ জুন পর্যন্ত, পনেরো দিন ধরে চলল এই লিখিত বিতর্ক, যা পরে “জঙ্গে মুকাদ্দাস” নামে বই আকারে ছাপা হয়।
আথম ছিলেন মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া একজন খ্রিস্টান প্রচারক। মহানবী (সা.) সম্পর্কে তিনি অত্যন্ত আপত্তিকর কথা লিখেছিলেন। বিতর্কের শেষ দিনে, ৫ জুন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ভবিষ্যদ্বাণী ঘোষণা করলেন। এই প্রবন্ধ সেই ভবিষ্যদ্বাণী নিয়েই।
আপত্তিটি কী
বিরোধীরা বলেন, ভবিষ্যদ্বাণী ছিল আথম পনেরো মাসের মধ্যে মারা যাবেন। কিন্তু ১৮৯৪ সালের সেপ্টেম্বরে পনেরো মাস পার হয়ে গেল, আথম বেঁচে রইলেন। তাই তাঁদের মতে ভবিষ্যদ্বাণীটি মিথ্যা প্রমাণিত হয়েছে, আর পরে “শর্ত” কথাটি টেনে এনে তা ঢাকার চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রশ্নটি ন্যায্য। উত্তরও তাই খুঁজতে হবে ভবিষ্যদ্বাণীর নিজের শব্দে।
ভবিষ্যদ্বাণীর আসল শব্দ
জঙ্গে মুকাদ্দাস গ্রন্থে (রূহানী খাযায়েন ৬, পৃ. ২৯১-২৯২) হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লেখেন, তিনি আল্লাহর কাছে কাতরভাবে ফয়সালা চেয়েছিলেন, আর তাঁকে এই নিদর্শন দেওয়া হলো। তার ভাবার্থ এমন:
“এই বিতর্কে দুই পক্ষের মধ্যে যে পক্ষ জেনেশুনে মিথ্যাকে গ্রহণ করছে, সত্য খোদাকে ছেড়ে একজন অসহায় মানুষকে খোদা বানাচ্ছে, সে বিতর্কের দিনগুলোর হিসাবে, প্রতিদিনের জন্য এক মাস ধরে, অর্থাৎ পনেরো মাসের মধ্যে ‘হাবিয়া’য় নিক্ষিপ্ত হবে এবং কঠিন লাঞ্ছনার শিকার হবে, শর্ত এই যে, সে সত্যের দিকে ফিরে না আসে।”
শেষ অংশটি লক্ষ করুন: “শর্ত এই যে, সে সত্যের দিকে ফিরে না আসে।” এটি পরে যোগ করা কোনো ব্যাখ্যা নয়। ১৮৯৩ সালে ছাপা মূল বাক্যেরই অংশ। অর্থাৎ শুরু থেকেই ভবিষ্যদ্বাণীর দুটি পথ খোলা ছিল: হয় শাস্তি, নয়তো সত্যের দিকে ফিরে এসে রক্ষা।
পনেরো মাসে আথমের অবস্থা
এবার দেখা যাক, ভবিষ্যদ্বাণী শোনার পর আথম কী করলেন। যিনি বিতর্কের মঞ্চে মহানবী (সা.)-কে নিয়ে কঠোর কথা বলতেন, সেই মানুষটি হঠাৎ চুপ হয়ে গেলেন। এই পনেরো মাসে তিনি ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কিছুই লিখলেন না।
শুধু তাই নয়, তিনি ভীষণ ভয়ের মধ্যে দিন কাটাতে লাগলেন। অমৃতসর ছেড়ে লুধিয়ানায় জামাইয়ের কাছে গেলেন, সেখান থেকে ফিরোজপুরে আরেক জামাইয়ের বাড়িতে আশ্রয় নিলেন। তিনি অভিযোগ করতেন, কখনও সাপ তাঁর পিছু নিচ্ছে, কখনও বর্শাধারী লোক তাঁকে আক্রমণ করতে আসছে। অথচ এসব “আক্রমণের” জন্য তিনি কোনো মামলা করেননি।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) পরে লিখেছেন, আথম নিজেই খ্রিস্টান পত্রিকা “নূর আফশাঁ”-তে স্বীকার করেছিলেন যে ভবিষ্যদ্বাণীর মেয়াদে তিনি ভয় পেয়েছিলেন (আঞ্জামে আথম, রূহানী খাযায়েন ১১, পৃ. ১৭)। যে মানুষ সত্যিই নিশ্চিত যে তাঁর ধর্ম সত্য আর প্রতিপক্ষের কথা ভিত্তিহীন, তিনি এভাবে শহর থেকে শহরে পালিয়ে বেড়ান না।
শপথের আহ্বান, তারপর শেষ পরিণতি
পনেরো মাস শেষ হলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ঘোষণা দিলেন, আথম অন্তরে সত্যের দিকে ঝুঁকেছিলেন বলেই শর্ত অনুযায়ী তিনি তখন রক্ষা পেয়েছেন। কিন্তু তিনি এটুকু বলে থেমে থাকেননি। তিনি বিষয়টি যাচাইয়ের একটি সহজ পথ খুলে দিলেন।
১৮৯৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে একের পর এক ইশতেহারে তিনি আথমকে আহ্বান জানালেন: আপনি যদি সত্যিই এই সময়ে সত্যের দিকে না ঝুঁকে থাকেন, তবে প্রকাশ্যে শপথ করে তা বলুন। শপথ করলে পুরস্কার দেওয়া হবে, আর শপথের পর এক বছরের মধ্যে যদি আপনি ঐশী শাস্তি থেকে রক্ষা পান, তবে আমাকে মিথ্যাবাদী মনে করবেন। পুরস্কারের অঙ্ক বাড়তে বাড়তে চার হাজার টাকায় পৌঁছায়।
আথম একবারও শপথ করলেন না। তাঁর পক্ষ থেকে অন্যরা কথা বললেন, কিন্তু যিনি নিজে সবচেয়ে ভালো জানতেন তাঁর অন্তরে কী ঘটেছিল, তিনি নীরব রইলেন।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন লিখলেন, পূর্ণ শাস্তি ততদিন থেমে থাকবে, যতদিন না আথম নিজেই নির্ভীকভাবে সত্য গোপন করে নিজের ধ্বংসের কারণ তৈরি করেন (আনওয়ারুল ইসলাম, রূহানী খাযায়েন ৯, পৃ. ৫)। ১৮৯৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তিনি শেষ ইশতেহার দিলেন। এর সাত মাসের মাথায়, ১৮৯৬ সালের ২৭ জুলাই, ফিরোজপুরে আব্দুল্লাহ আথম মারা গেলেন। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন জীবিত, আর তিনি আরও প্রায় বারো বছর বেঁচে ছিলেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“শর্ত” বলে কি যেকোনো ব্যর্থতা ঢেকে দেওয়া যায় না?
এখানে কেউ কেউ বলেন, শাস্তির ভবিষ্যদ্বাণীতে শর্ত রাখা মানেই পালানোর পথ রাখা। চলুন কুরআন দেখি। ফেরাউনের দরবারে এক মু’মিন ব্যক্তি হযরত মূসা (আ.)-এর পক্ষে বলেছিলেন:
“কিয়দংশ”, পুরোটা নয়। কুরআন নিজেই বলছে, সত্য নবীর শাস্তির সতর্কবাণীর সবটুকু সবসময় ঘটে না। আর হযরত ইউনুস (আ.)-এর জাতির কথা তো সবাই জানেন:
হযরত ইউনুস (আ.) শাস্তির খবর দিয়েছিলেন, জাতি ফিরে এলো, শাস্তি সরে গেল। কেউ তাঁকে মিথ্যা নবী বলেন না। আর আথমের ক্ষেত্রে শর্তটি তো ভবিষ্যদ্বাণীর মূল বাক্যেই লেখা ছিল। তার ওপর শপথের আহ্বান দিয়ে বিষয়টি যাচাইযোগ্যও করে দেওয়া হয়েছিল। যে ব্যাখ্যা যাচাইয়ের জন্য খোলা রাখা হয়, তাকে লুকোনোর কৌশল বলা যায় না।
আথম তো মুসলমান হননি, তাহলে “সত্যের দিকে ফেরা” হলো কীভাবে?
ভবিষ্যদ্বাণীর শর্ত ছিল “সত্যের দিকে ফিরে আসা”, “মুসলমান হওয়া” নয়। ভয় পেয়ে ঔদ্ধত্য ছেড়ে দেওয়া, ইসলামের বিরুদ্ধে কলম থামিয়ে দেওয়াও এক ধরনের ফেরা। কুরআন ফেরাউনের জাতির কথা বলে, যারা শাস্তির সময় হযরত মূসা (আ.)-এর কাছে দোয়া চাইত:
তারা মুসলমান হয়নি, তবু সাময়িক নত হওয়াতেই আল্লাহ শাস্তি সরিয়েছিলেন। পরে তারা অঙ্গীকার ভাঙল, আর শেষে ধরা পড়ল। আথমের গল্পও এই পথেই চলেছে: ভয়ে নত হওয়ায় অবকাশ, সত্য গোপন করায় পরিণতি।
পনেরো মাস পরে মারা যাওয়া কি কাকতালীয় নয়?
প্রশ্ন হলো, আথম যদি সত্যিই ভয় না পেয়ে থাকেন, তবে চার হাজার টাকার পুরস্কার থাকা সত্ত্বেও একটি বাক্যের শপথ করতে তাঁর আপত্তি কোথায় ছিল? শপথ করলেই তো প্রতিপক্ষ চিরতরে পরাজিত হতো। তিনি তা করেননি। আর শেষ সতর্কবাণীর সাত মাসের মধ্যে, যাঁর বিরুদ্ধে তিনি বিতর্ক করেছিলেন তাঁর জীবদ্দশাতেই, তিনি পৃথিবী ছাড়লেন। ঘটনাগুলো একটির পর একটি সাজিয়ে দেখলে একে নিছক কাকতাল বলা কঠিন।
সংক্ষেপে
- ১৮৯৩ সালের ভবিষ্যদ্বাণীর মূল বাক্যেই শর্ত ছিল: “শর্ত এই যে, সে সত্যের দিকে ফিরে না আসে” (জঙ্গে মুকাদ্দাস, রূহানী খাযায়েন ৬, পৃ. ২৯১-২৯২)।
- পনেরো মাসে আথম ইসলামের বিরুদ্ধে নীরব ছিলেন, ভয়ে শহর থেকে শহরে ঘুরেছেন এবং ভয়ের কথা নিজেই স্বীকার করেছেন।
- পুরস্কার বাড়িয়ে চার হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া সত্ত্বেও তিনি শপথ করে বলেননি যে তিনি সত্যের দিকে ঝোঁকেননি।
- কুরআনে শাস্তির সতর্কবাণী নত হওয়ায় সরে যাওয়ার উদাহরণ আছে (৪০:২৯, ১০:৯৯, ৪৩:৫০-৫১)।
- শেষ ইশতেহারের সাত মাস পর, ১৮৯৬ সালের ২৭ জুলাই, আথম ফিরোজপুরে মারা যান।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.