একজন দক্ষ কারিগর বহু বছর ধরে একটি প্রাসাদ গড়লেন। দেয়ালে দেয়ালে কারুকাজ, অপূর্ব নকশা। মানুষ ঘুরে ঘুরে দেখে আর মুগ্ধ হয়। কিন্তু সবার চোখ আটকে যায় এক কোণে। সেখানে একটি ইটের জায়গা খালি। সবাই বলে, আহা, এই ইটটি বসানো হলে প্রাসাদটি পূর্ণ হতো!
এই উপমাটি মহানবী (সা.)-এর নিজের। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:
বিরোধী আলেমরা বলেন, প্রাসাদ পূর্ণ, আর কোনো ইট বসানোর জায়গা নেই; তাই আর কোনো নবী আসবেন না। চলুন উপমাটি ধীরে ধীরে খুলি।
প্রাসাদটি কীসের?
প্রথমে খেয়াল করুন একটি ছোট্ট শব্দ: মিন কাবলী, “আমার আগের”। মহানবী (সা.) তুলনা করছেন নিজের সঙ্গে তাঁর আগের নবীদের। উপমাটি পেছনের ইতিহাসের কথা বলছে, তাঁর পরের কথা নয়।
তাহলে প্রাসাদটি কী? সহীহ বুখারীর সবচেয়ে বিখ্যাত ব্যাখ্যাকার আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী (রহ.) লিখেছেন: ভবনের পূর্ণতা মানে, ইসলামের শরীয়ত আগের সব উত্তম শরীয়তের চেয়ে মর্যাদায় পূর্ণতর (ফাতহুল বারী, কিতাবুল মানাকিব, খাতামান নাবিয়্যীন অধ্যায়)।
অর্থাৎ প্রাসাদটি ঐশী শরীয়তের। প্রতিটি নবী তাঁর যুগের প্রয়োজন অনুযায়ী এই প্রাসাদে কিছু যোগ করেছেন। শেষ ইটটি এল কুরআনের মাধ্যমে, আর প্রাসাদ পূর্ণ হলো। কুরআন নিজেই সেই মুহূর্তের ঘোষণা দিয়েছে:
আহমদী মুসলমানরা এই উপমার সঙ্গে কোথায় একমত
পুরোপুরি একমত। শরীয়তের প্রাসাদ সম্পূর্ণ। এতে আর কোনো নতুন ইট বসবে না, কোনো নতুন আইন আসবে না, কোনো নবী এসে এই প্রাসাদের একটি ইটও বদলাবেন না। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত “Truth Prevails” বইয়ে এই হাদীস নিয়ে বলা হয়েছে, এখানে মহানবী (সা.) নিজেকে তাঁর আগের নবীদের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যাঁরা প্রত্যেকে নিজ নিজ স্থানে স্বাধীন নবী ছিলেন; আর এই স্বাধীন নবীদের মধ্যে তিনিই শেষ।
তাহলে উম্মতী নবী কোথায়? তিনি এই প্রাসাদে নতুন কোনো ইট নন। তিনি প্রাসাদের বাইরের কেউও নন। তিনি সেই শেষ ইটেরই প্রতিচ্ছবি, মহানবী (সা.)-এর আলোয় আলোকিত। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, এই নবুয়্যত মহানবী (সা.)-এর নবুয়্যতেরই প্রতিচ্ছবি, তাঁর মাধ্যমে দেওয়া, তাঁরই প্রকাশ (চশমায়ে মারেফাত, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২৩, পৃষ্ঠা ৩৪০)। আয়নায় প্রাসাদের প্রতিবিম্ব পড়লে প্রাসাদে নতুন ইট যোগ হয় না।
আরও একটি দিক লক্ষ করুন। উপমায় মানুষ প্রাসাদের চারপাশে ঘুরে মুগ্ধ হয়, আর শেষ ইটের অভাব অনুভব করে। শেষ ইট বসার পর কি মানুষ প্রাসাদ ছেড়ে চলে যায়? না, তখনই প্রাসাদ বসবাসের যোগ্য হয়। পূর্ণ শরীয়তের এই প্রাসাদেই কিয়ামত পর্যন্ত মানুষ বাস করবে। এই প্রাসাদের যত্ন নেওয়া, এর ধুলো ঝাড়া, এর আলো জ্বালিয়ে রাখার জন্য আল্লাহ যুগে যুগে সংস্কারক পাঠান। তাঁরা প্রাসাদে নতুন কোনো ইট গাঁথেন না; প্রাসাদটিকে তার আসল রূপে ফিরিয়ে আনেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
হাদীসে তো “আমি খাতামান নাবিয়্যীন” কথাটি ইটের সঙ্গেই এসেছে; তাহলে অর্থ তো শেষ?
বিরোধী আলেমরাও যাঁকে বড় চিন্তাবিদ মানেন, সেই আল্লামা ইবনে খালদুন এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন: মানুষ খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ করে প্রাসাদ পূর্ণ করা ইটের সঙ্গে মিলিয়ে; কিন্তু আসলে এর অর্থ সেই নবী, যাঁর আগমনে নবুয়্যত পূর্ণতা পেয়েছে (আল-মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা ৩০০)। পূর্ণতা আর বন্ধ হয়ে যাওয়া এক জিনিস নয়। একটি পূর্ণ প্রাসাদে মানুষ বসবাস করে, তার আলো চারদিকে ছড়ায়।
প্রাসাদ পূর্ণ হলে ঈসা (আ.) ফিরে এলে তাঁর জায়গা কোথায়?
এই প্রশ্নটি আসলে বিরোধী আলেমদের দিকেই ফিরে যায়। তাঁরা বিশ্বাস করেন, ঈসা (আ.) নবী হিসেবেই ফিরে আসবেন, আর সহীহ মুসলিমে তাঁকে “আল্লাহর নবী” বলা হয়েছে। প্রাসাদ সম্পূর্ণ হওয়ার মানে যদি হয় শেষ ইটের পরে আর কোনো নবীর কাজ নেই, তাহলে তাঁদের বিশ্বাসে একজন স্বাধীন, বনী ইসরাঈলী নবী আবার এসে কাজ করবেন কীভাবে? আহমদী মুসলমানদের ব্যাখ্যায় এই জট নেই: প্রাসাদ শরীয়তের, তা পূর্ণ; আর আগমনকারী মসীহ এই উম্মতেরই একজন, যিনি সেই প্রাসাদেই বাস করেন, তাকে নতুন করে আলোকিত করেন।
তিরমিযীর বর্ণনাতেও কি একই কথা নেই?
জামে তিরমিযীতে (হাদীস ৩৬১৩) হযরত উবাই বিন কাব (রা.)-এর বর্ণনায় একই উপমা এসেছে, আর সেখানেও কথাটি হলো, “নবীদের মধ্যে আমি সেই ইটের স্থানে।” একই বর্ণনার শেষে মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, কিয়ামতের দিন তিনি হবেন নবীদের ইমাম, তাঁদের মুখপাত্র এবং তাঁদের শাফায়াতকারী। উপমার পুরো সুরটাই মর্যাদার: তিনি নবীদের মুকুট, তাঁদের নেতা।
এভাবে উপমাটি তার আসল সৌন্দর্যে ফিরে আসে। এটি মহানবী (সা.)-এর পূর্ণতার ঘোষণা, তাঁর আনা শরীয়তের চিরস্থায়িত্বের ঘোষণা। এই উপমা দিয়ে তাঁর উম্মতকে আল্লাহর বাক্যালাপ আর আধ্যাত্মিক উন্নতি থেকে বঞ্চিত বলার কোনো সুযোগ নেই।
সংক্ষেপে
- উপমায় মহানবী (সা.) নিজেকে “আমার আগের” নবীদের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
- ইবনে হাজার (রহ.)-এর ব্যাখ্যায় প্রাসাদের পূর্ণতা মানে ইসলামী শরীয়তের পূর্ণতা, যা কুরআনের ৫:৪ আয়াতেও ঘোষিত।
- আহমদী মুসলমানরা মানেন, শরীয়তের প্রাসাদে আর কোনো ইট বসবে না; উম্মতী নবী নতুন ইট নন, শেষ ইটেরই প্রতিচ্ছবি।
- ইবনে খালদুনের ভাষায় খাতামান নাবিয়্যীন সেই নবী, যাঁর মাধ্যমে নবুয়্যত পূর্ণতা পেয়েছে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Meaning of Khatamiyyat According to Ahadith · alislam.org
- Chapter II · Truth Prevails · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.