প্রতি বছর রমযানের শেষ দশকে কোটি কোটি মুসলমান জেগে থাকেন একটি রাতের খোঁজে, লাইলাতুল কদর। কেন? কারণ কুরআন বলেছে, সেই রাতে আকাশ থেকে কিছু নেমে আসে:
ক্রিয়াপদটি লক্ষ করুন: তানাযযালু, “নাযেল হয়”। কোনো অতীতের ঘটনা নয়, প্রতি বছরের চলমান সত্য। আর সেই নেমে আসা দলের মধ্যে আছেন “রূহ”, যে নামটি কুরআন জিবরাঈল (আ.)-এর জন্য ব্যবহার করেছে: “বিশ্বস্ত ‘রূহুল আমীন’ (জিবরাঈল) ইহাকে লইয়া নাযেল হইয়াছে” (সূরা আশ-শুআরা ২৬:১৯৪)।
তবু একটি কথা প্রচলিত আছে: মহানবী (সা.)-এর ইন্তেকালের পর জিবরাঈল (আ.) আর পৃথিবীতে নামবেন না। আর এর ভিত্তিতে বলা হয়, ওহীর সব দরজা বন্ধ।
বর্ণনাটির ভিত্তি কতটুকু
প্রথমে দেখা দরকার, এমন কথার ভিত্তি কী। আলইসলাম ডট অর্গে এ প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। আহলে হাদীস আলেম নওয়াব নূরুল হাসান খান, যিনি নওয়াব সিদ্দীক হাসান খানের পুত্র, এই প্রসঙ্গে একটি প্রচলিত কথা সম্পর্কে স্পষ্ট লিখেছেন: “লা ওয়াহইয়া বা’দা মাওতী”, অর্থাৎ “আমার মৃত্যুর পরে কোনো ওহী নেই”, এই তথাকথিত হাদীস ভিত্তিহীন (ইকতিরাবুস সাআ, পৃষ্ঠা ১৬২)।
যে কথার ভিত্তি নেই, তা দিয়ে কুরআনের স্পষ্ট আয়াত বাতিল করা যায় না। চলুন দেখি কুরআন কী বলে।
ফিরিশতারা আজও নামেন
আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যায়, এই আয়াত স্পষ্ট করে যে শরীয়তবিহীন ওহীর দরজা সত্যিকারের মুসলমানদের জন্য খোলা থাকবে। ফিরিশতারা আল্লাহর বার্তা নিয়েই নামেন; বাণী পৌঁছানো তাঁদের কাজ।
আরেকটি আয়াতে আল্লাহ নিজের স্থায়ী রীতি জানিয়েছেন:
বিরোধী আলেমরাও যা মানেন
সবচেয়ে বড় প্রমাণটি আসে সহীহ মুসলিম থেকে। শেষ যুগের ঘটনাবলি বর্ণনা করতে গিয়ে মহানবী (সা.) বলেছেন:
অর্থাৎ প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ীও মহানবী (সা.)-এর পরে অন্তত একজনের উপর আল্লাহর ওহী নামবে। তাহলে “তাঁর পরে আর কোনো ওহী নেই” কথাটি তাঁদের নিজেদের বিশ্বাসেই টেকে না।
একটু থেমে ভাবুন। যদি সত্যিই আল্লাহর ফিরিশতারা আর কখনো কোনো মানুষের কাছে না আসেন, তাহলে প্রতি বছর লাইলাতুল কদরের প্রতীক্ষা কীসের জন্য? আর ৪১:৩১ আয়াতের প্রতিশ্রুতি, “তাহাদের উপর ফিরিশ্তাগণ নাযেল হয়”, কাদের জন্য? এই আয়াতগুলো কুরআনে কিয়ামত পর্যন্ত পড়া হবে। এগুলো কোনো বিগত যুগের স্মৃতিকথা নয়, বরং প্রতিটি অবিচল মু’মিনের জন্য আল্লাহর জীবন্ত প্রতিশ্রুতি।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
কুরআনের ওহী তো শেষ; তাহলে জিবরাঈল (আ.)-এর আর কাজ কী?
কুরআনের ওহী, অর্থাৎ শরীয়তের ওহী, শেষ হয়েছে, এ কথা আহমদী মুসলমানরা দৃঢ়ভাবে মানেন। কুরআন পরিপূর্ণ শরীয়ত; এতে কিছু যোগ বা বিয়োগ হবে না। কিন্তু ওহী মানেই শরীয়ত নয়। মূসা (আ.)-এর মা ওহী পেয়েছিলেন (সূরা আল-কাসাস ২৮:৮), ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীরা পেয়েছিলেন (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১২); তাঁরা কেউ শরীয়ত পাননি। সান্ত্বনা, সুসংবাদ, সতর্কবাণী, ভবিষ্যতের খবর, এসব নিয়ে ফিরিশতাদের অবতরণ চলমান।
লাইলাতুল কদরে নামা আর ওহী নিয়ে নামা কি এক?
৯৭:৫ আয়াত বলছে, ফিরিশতারা ও রূহ নামেন “যাবতীয় বিষয়সহ”, আল্লাহর হুকুম নিয়ে। আর ১৬:৩ আয়াত বলছে, আল্লাহ যাকে চান তার উপর ফিরিশতাদের “বাণী সহ” অবতীর্ণ করেন। দুই আয়াতেই ক্রিয়াপদ চলমান কালের। যাঁরা বলেন জিবরাঈল (আ.) বা ফিরিশতাদের অবতরণ চিরতরে বন্ধ, তাঁদের প্রমাণ দিতে হবে কুরআনের এমন একটি আয়াত দিয়ে, যা এই চলমান রীতিকে থামিয়ে দিয়েছে। এমন কোনো আয়াত নেই।
তাহলে কি যে কেউ দাবি করলেই মেনে নিতে হবে যে তার উপর ওহী নামে?
একেবারেই না। দাবি পরীক্ষা করতে হয় কুরআনের মাপকাঠিতে: আল্লাহর নামে মিথ্যা রচনাকারী সফল হয় না, আর আল্লাহ ও তাঁর রসূলেরা বিজয়ী হন (সূরা আল-মুজাদালা ৫৮:২২)। তবে দরজা খোলা থাকা আর প্রত্যেক দাবি মেনে নেওয়া এক কথা নয়। আল্লাহর এই নিয়ামত বন্ধ বলে ঘোষণা দেওয়ার অধিকার কারো নেই।
আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বিশ্বাস তাই ভারসাম্যপূর্ণ। কুরআনের শরীয়ত পূর্ণ, এতে আর কোনো ওহী যোগ হবে না। কিন্তু আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের নিয়ামত, ফিরিশতাদের অবতরণ আর সুসংবাদের ধারা মহানবী (সা.)-এর উম্মতে চিরকাল চলবে। এটাই এই উম্মতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ।
সংক্ষেপে
- লাইলাতুল কদরে ফিরিশতারা ও “রূহ” নামেন; কুরআন এটিকে চলমান রীতি হিসেবে বর্ণনা করেছে (৯৭:৫)।
- অবিচল মু’মিনদের উপর ফিরিশতাদের অবতরণের প্রতিশ্রুতি স্থায়ী (৪১:৩১), আর আল্লাহ যাকে চান তার উপর বাণীসহ ফিরিশতা পাঠান (১৬:৩)।
- “আমার মৃত্যুর পরে ওহী নেই” কথাটিকে আহলে হাদীস আলেম নওয়াব নূরুল হাসান খান ভিত্তিহীন বলেছেন।
- সহীহ মুসলিম অনুযায়ী শেষ যুগে আল্লাহ ঈসার প্রতি ওহী করবেন; তাই প্রচলিত বিশ্বাসেও ওহীর দরজা পুরো বন্ধ নয়।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- The Real Significance of Hadith La Nabiyya Ba‘di · alislam.org
- The Concept of Revelation in Islam · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.