‘রঙ্গিলা রসূল’ বইয়ের জন্য কি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) দায়ী?

একটি বই লেখা হলো ১৯২৪ সালে, আর যাঁকে দায়ী করা হচ্ছে তিনি ইন্তেকাল করেছেন ১৯০৮ সালে। তারিখগুলো পাশাপাশি রাখলেই গল্পটা বদলে যায়।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

বিংশ শতাব্দীর বিশের দশক। লাহোর থেকে একটি পুস্তিকা বের হলো, নাম “রঙ্গিলা রসূল”। এতে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে নিয়ে এমন কুৎসা লেখা হয়েছিল যে, গোটা উপমহাদেশের মুসলমানদের হৃদয় রক্তাক্ত হয়েছিল। সেই ক্ষোভ এত তীব্র ছিল যে, পরে প্রকাশককে হত্যার ঘটনাও ঘটে।

এই বেদনাদায়ক ঘটনার দায় কার? একটি আপত্তিতে বলা হয়, এর পেছনে নাকি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর লেখা দায়ী।

আপত্তিটি কী

বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) হিন্দুদের উপাস্য সম্পর্কে অশোভন ভাষা ব্যবহার করে তাদের ক্ষেপিয়ে দিয়েছিলেন। এর প্রতিক্রিয়ায় হিন্দুরা মহানবী (সা.)-এর অবমাননায় নামে, আর তারই ফল “রঙ্গিলা রসূল”।

এই অভিযোগে দুটি দাবি আছে। এক, তাঁর লেখার প্রতিক্রিয়ায় বইটি লেখা হয়েছে। দুই, তিনি হিন্দুদের উপাস্য সম্পর্কে অশ্লীল কথা বলেছেন। দুটিই একে একে দেখি।

তারিখ কী বলে

হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) ইন্তেকাল করেন ১৯০৮ সালের ২৬ মে। আর “রঙ্গিলা রসূল” রচিত হয় ১৯২৪ সালে, অর্থাৎ তাঁর ইন্তেকালের প্রায় ষোল বছর পরে।

এমনকি তাঁর জীবনের শেষ বইটি ছিল হিন্দু ও মুসলমানদের মধ্যে শান্তির আহ্বান। এর নাম “পয়গামে সুলহ”, ইংরেজিতে A Message of Peace। এটি তাঁর শেষ রচনা, আর এতে এক আল্লাহর ইবাদতের ভিত্তিতে সব মানুষের শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের পথ দেখানো হয়েছে। সেখানে তাঁর একটি বাক্য উদ্ধৃত হয়েছে: যে ধর্ম সর্বজনীন সহানুভূতি শেখায় না, তা কোনো ধর্মই নয়।

যিনি জীবনের শেষ দিনগুলোতে হিন্দু-মুসলমানের মিলনের জন্য বই লিখছিলেন, তাঁর ইন্তেকালের ষোল বছর পরের একটি বিদ্বেষী পুস্তিকার দায় তাঁর উপর চাপানো ইতিহাসের সঙ্গে মেলে না।

✦

যে বাক্য নিয়ে আপত্তি, সেটি কার কথা

এবার দ্বিতীয় দাবি। রূহানী খাযায়েন ২৩ খণ্ডে চশমায়ে মারেফাত গ্রন্থের ১১৪ পৃষ্ঠায় হযরত মসীহ মওউদ (আ.) আর্য সমাজের কিছু শিক্ষার যুক্তিভিত্তিক খণ্ডন করেছেন। আলোচনার এক পর্যায়ে তিনি আর্যদের একটি ধারণা উল্লেখ করেছেন, যেখানে পরমেশ্বরের অবস্থান সম্পর্কে একটি অশোভন কথা বলা হয়েছে। আর সেই ধারণাটিকে তিনি নিজেই “অত্যন্ত নোংরা ও লজ্জাকর শিক্ষা” বলে আখ্যা দিয়েছেন।

অর্থাৎ অশোভন কথাটি তাঁর নিজের বিশ্বাস বা তাঁর নিজের ভাষা নয়। তিনি একটি মতবাদের সমালোচনা করতে গিয়ে সেই মতবাদের কথা উদ্ধৃত করেছেন, এবং তার নিন্দা করেছেন। যে কথাকে তিনি নিজেই লজ্জাকর বলছেন, সেটিকে তাঁর মুখে বসিয়ে দেওয়া সঠিক উদ্ধৃতি নয়।

কুরআন আমাদের শিক্ষা দেয়, অন্যদের উপাস্যকে গালি দিও না:

وَلَا تَسُبُّوا الَّذِیۡنَ یَدۡعُوۡنَ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ فَیَسُبُّوا اللّٰہَ عَدۡوًۢا بِغَیۡرِ عِلۡمٍ
“এবং তোমরা তাহাদিগকে গালি দিও না। যাহাদিগকে তাহারা আল্লাহ্‌কে ছাড়িয়া (মা’বূদরূপে) ডাকে, নতুবা তাহারা শত্রুতাবশতঃ অজ্ঞতার কারণে আল্লাহ্‌কে গালি দিবে…”
সূরা আল-আন‘আম ৬:১০৯
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬:১০৮।

গালি দেওয়া আর একটি মতবাদের যুক্তিভিত্তিক সমালোচনা করা এক জিনিস নয়। কুরআন নিজেও মূর্তিপূজা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের কঠোর সমালোচনা করেছে, কিন্তু কাউকে গালি দেয়নি। হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর পথও ছিল এটাই।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

তাঁর বিতর্কগুলো কি হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক তিক্ত করেনি?

এখানে কেউ কেউ বলেন, সরাসরি না হলেও তাঁর আর্য সমাজের সঙ্গে বিতর্কের ফলেই পরিবেশ উত্তপ্ত হয়েছিল। চলুন দেখি। আর্য সমাজের পক্ষ থেকে ইসলাম ও মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে আক্রমণ তখন আগে থেকেই চলছিল। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) সেসব আক্রমণের জবাব দিয়েছেন যুক্তি ও কলম দিয়ে। আর জীবনের শেষ বইয়ে তিনি নিজেই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে শান্তির প্রস্তাব রেখে গেছেন। আক্রমণের জবাব দেওয়াকে উত্তেজনার কারণ বলা মানে আত্মরক্ষাকারীকে দোষ দেওয়া।

অন্য ধর্মের মহাপুরুষদের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি কী ছিল?

এখানে কেউ কেউ ধরে নেন, যিনি আর্য সমাজের মতবাদের কঠোর সমালোচক, তিনি নিশ্চয়ই হিন্দুদের সবকিছুকেই অসম্মান করতেন। বাস্তবে তাঁর শিক্ষা ছিল উল্টো। তিনি কুরআনের এই শিক্ষার উপর জোর দিতেন:

وَاِنۡ مِّنۡ اُمَّۃٍ اِلَّا خَلَا فِیۡہَا نَذِیۡرٌ
“…এবং এমন কোন জাতি নাই যাহার নিকট সতর্ককারী আগমন করে নাই।”
সূরা আল-ফাতির ৩৫:২৫

আহমদীয়া বাংলায় প্রকাশিত আলোচনায় তাঁর এই বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে: কুরআনের বিশেষ সৌন্দর্য হলো, আল্লাহ নিজেকে কোনো একটি জাতির মধ্যে সীমাবদ্ধ করেননি; প্রত্যেক জাতিতে পথপ্রদর্শক এসেছেন, আর কুরআন তাঁদের সবার সম্মান প্রতিষ্ঠা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই তিনি লিখেছেন যে, ভারতবর্ষেও আল্লাহর পক্ষ থেকে নবী এসেছিলেন (রূহানী খাযায়েন ২৩ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৮২)।

“পয়গামে সুলহ”-এ পারস্পরিক ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধার আহ্বান জানানো হয়েছে। তাঁর শিক্ষা ছিল, অন্যের ধর্মীয় নেতাদের অসম্মান না করে নিজের সত্য যুক্তি দিয়ে তুলে ধরো। যিনি এই শিক্ষা দেন, তাঁকে হিন্দুদের ক্ষেপিয়ে দেওয়ার দায়ে অভিযুক্ত করা বাস্তবতার বিপরীত।

ইতিহাসের সাক্ষ্য তাই পরিষ্কার। যে পুস্তিকার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়, তা লেখা হয়েছে তাঁর ইন্তেকালের বহু বছর পরে। যে অশোভন কথার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়, সেটিকে তিনি নিজেই নিন্দা করেছেন। আর জীবনের শেষ বইয়ে তিনি হিন্দু-মুসলমানের মিলনের পথ দেখিয়ে গেছেন। একজন ন্যায়পরায়ণ পাঠকের জন্য এই তিনটি তথ্যই যথেষ্ট। মহানবী (সা.)-এর সম্মান রক্ষার প্রকৃত পথও এটাই: সত্যকে সত্য বলা, আর কারও উপর এমন দায় না চাপানো, যা তাঁর নয়। কুরআন আমাদের শিখিয়েছে, কোনো খবর এলে আগে যাচাই করতে (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭)। এখানে তারিখ দুটি যাচাই করলেই সত্য বেরিয়ে আসে।

সংক্ষেপে

  1. “রঙ্গিলা রসূল” রচিত হয়েছে ১৯২৪ সালে, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর ইন্তেকালের (১৯০৮) প্রায় ষোল বছর পরে।
  2. যে অশোভন কথার জন্য তাঁকে দায়ী করা হয়, তা ছিল আর্য সমাজের একটি ধারণা, যাকে তিনি নিজেই “নোংরা ও লজ্জাকর” বলেছেন (চশমায়ে মারেফাত, পৃ. ১১৪)।
  3. কুরআন অন্যের উপাস্যকে গালি দিতে নিষেধ করে; তিনি গালি নয়, যুক্তি দিয়ে মতবাদের সমালোচনা করেছেন।
  4. তাঁর শেষ বই “পয়গামে সুলহ” ছিল হিন্দু-মুসলমানের শান্তির আহ্বান।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.