১৮৯৪ সালের রমযান: আকাশ যেদিন সাক্ষ্য দিল

এক হাজার বছরেরও বেশি আগে লিখে রাখা হয়েছিল, মাহদীর জন্য রমযানে চাঁদ আর সূর্যে নির্দিষ্ট তারিখে গ্রহণ লাগবে। ১৮৯৪ সালে, একজন দাবিকারক যখন উপস্থিত, তখন আকাশে ঠিক সেটিই ঘটল।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

১৮৯৪ সালের মার্চ মাস। পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম কাদিয়ান। রমযানের তেরো তারিখ, সূর্য ডোবার পর মানুষ আকাশে তাকিয়ে দেখল, পূর্ণ হতে চলা চাঁদের গায়ে কালো ছায়া নামছে। চন্দ্রগ্রহণ।

পনেরো দিন পর, একই রমযানের আটাশ তারিখ, শুক্রবারের সকাল। এবার সূর্যের গায়ে ছায়া। যাঁরা হাদীস জানতেন, তাঁদের মনে পড়ল একটি পুরনো ভবিষ্যদ্বাণী। আর কাদিয়ানে তখন একজন মানুষ উপস্থিত, যিনি কয়েক বছর আগেই দাবি করেছেন, তিনিই প্রতিশ্রুত মসীহ্ ও মাহদী।

এক হাজার বছর আগের লেখা

হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম আলী ইবনে উমর আদ-দারাকুতনী (রহ.) হিজরী চতুর্থ শতাব্দীতে তাঁর সুনান-এ একটি বর্ণনা লিখে রেখেছিলেন। বর্ণনাকারী মহানবী (সা.)-এর বংশধর ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকের (রহ.):

إِنَّ لِمَهْدِيِّنَا آيَتَيْنِ لَمْ تَكُونَا مُنْذُ خَلْقِ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَنْكَسِفُ الْقَمَرُ لِأَوَّلِ لَيْلَةٍ مِنْ رَمَضَانَ، وَتَنْكَسِفُ الشَّمْسُ فِي النِّصْفِ مِنْهُ
“নিশ্চয় আমাদের মাহদীর জন্য দুটি নিদর্শন আছে, যা আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির পর থেকে (কারও জন্য) প্রকাশ পায়নি: রমযানে চাঁদের গ্রহণ হবে (গ্রহণের রাতগুলোর) প্রথম রাতে, আর সূর্যের গ্রহণ হবে (গ্রহণের দিনগুলোর) মাঝের দিনে।”
সুনান দারাকুতনী, কিতাবুল ঈদাইন, বাবু সিফাতি সালাতিল খুসূফ ওয়াল কুসূফ

কুরআনেও শেষ যুগের নিদর্শন হিসেবে চাঁদ ও সূর্যের গ্রহণের কথা আছে:

وَخَسَفَ الْقَمَرُ ۝ وَجُمِعَ الشَّمْسُ وَالْقَمَرُ
“এবং চন্দ্রে গ্রহণ লাগিবে, এবং সূর্য এবং চন্দ্র উভয়কে (গ্রহণে) একত্রিত করা হইবে,”
সূরা আল-কিয়ামাহ ৭৫:৯-১০
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ৭৫:৮-৯।

“প্রথম রাত” আর “মাঝের দিন”-এর হিসাব

আল্লাহ্ চাঁদ-সূর্যের চলার যে নিয়ম বানিয়েছেন, তাতে চন্দ্রগ্রহণ হতে পারে কেবল পূর্ণিমার কাছাকাছি, চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ বা ১৫ তারিখের রাতে। আর সূর্যগ্রহণ হতে পারে কেবল অমাবস্যার কাছাকাছি, ২৭, ২৮ বা ২৯ তারিখে।

তাহলে চন্দ্রগ্রহণের “প্রথম রাত” মানে ১৩ তারিখ, আর সূর্যগ্রহণের “মাঝের দিন” মানে ২৮ তারিখ। হাদীসে চাঁদের জন্য কমর শব্দ এসেছে, হিলাল নয়। আরবি অভিধানে প্রথম দুই-তিন রাতের সরু চাঁদকে বলে হিলাল; তার পরের চাঁদ কমর। অর্থাৎ শব্দটিই বলে দিচ্ছে, রমযানের প্রথম তারিখের হিলালের কথা হচ্ছে না।

এবার ইতিহাস মিলিয়ে দেখুন। হিজরী ১৩১১ সনের রমযানের ১৩ তারিখ (২১ মার্চ ১৮৯৪) সন্ধ্যায় চন্দ্রগ্রহণ হলো, আর ২৮ তারিখ (৬ এপ্রিল ১৮৯৪) শুক্রবার সকালে সূর্যগ্রহণ। দুটিই ভারতবর্ষ থেকে দেখা গেছে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) আর তাঁর সাহাবীরা কাদিয়ান থেকে এই গ্রহণ দেখেছেন। সে সময়ের পত্রিকা আজাদ আর সিভিল অ্যান্ড মিলিটারি গেজেট-এও এর খবর ছাপা হয়েছিল, আর ওপলজারের বিখ্যাত গ্রহণ-তালিকাতেও এই তারিখগুলো আছে।

পরের বছর, ১৩১২ হিজরীর রমযানে (মার্চ ১৮৯৫) পৃথিবীর পশ্চিম গোলার্ধে আবার একই তারিখে এই দুটি গ্রহণ হয়েছিল।

✦

নিদর্শন, যা আগে থেকে ঘোষিত

হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) এই নিদর্শন নিয়ে আরবিতে নূরুল হক নামে বই লিখেছেন। তিনি দেখিয়েছেন, “প্রথম” আর “মাঝ” শব্দ দুইভাবে পূর্ণ হয়েছে: তারিখে, আর সময়েও। চন্দ্রগ্রহণ শুধু প্রথম রাতেই হয়নি, রাতের শুরুতেই হয়েছিল; আর সূর্যগ্রহণ দুপুরের আগেই শেষ হয়েছিল, দিনের প্রথম অর্ধেকের ভেতরে।

খলীফাতুল মসীহ্ পঞ্চম (আই.) এক খুতবায় হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.)-এর এই কথা উদ্ধৃত করেছেন: প্রতীক্ষিত ব্যক্তির দাবির পরে গ্রহণ হওয়া এমন বিষয়, যা কোনো মানুষ বানাতে পারে না। আমাদের প্রচারপত্র যেখানে পৌঁছায়নি, সেখানেও এই চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ ঘোষণা করে দিয়েছে যে প্রতীক্ষিত ব্যক্তির যুগ এসে গেছে।

আরও আশ্চর্যের বিষয়, এই নিদর্শনের অনেক বছর আগেই বারাহীনে আহমদীয়ায় তাঁর একটি ইলহাম প্রকাশিত হয়েছিল: “বলো, আমার কাছে আল্লাহর সাক্ষ্য আছে, তোমরা কি মানবে?” পরে তিনি কসম খেয়ে লিখেছেন, এই ইলহামে এই গ্রহণের নিদর্শনের কথাই বলা হয়েছিল (তোহফায়ে গোলড়বিয়া, পৃষ্ঠা ৫৩)। হাকীকাতুল ওহীতেও তিনি লিখেছেন, নিদর্শনটি প্রকাশের আগেই আল্লাহ্ তাঁকে এর খবর দিয়েছিলেন এবং তা লাখো মানুষের কাছে ঘোষিত হয়েছিল (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১৯৫)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

রমযানে চাঁদ আর সূর্যের গ্রহণ তো আগেও বহুবার হয়েছে?

হ্যাঁ, হয়েছে; আর হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তা অস্বীকারও করেননি। হাদীসটি খেয়াল করে পড়ুন: লাম তাকূনা, “যে দুটি (নিদর্শন) প্রকাশ পায়নি”। শব্দটি স্ত্রীবাচক, আর আরবিতে আয়াত (নিদর্শন) শব্দটিও স্ত্রীবাচক। অর্থাৎ বলা হচ্ছে, এই গ্রহণ কারও সত্যতার নিদর্শন হিসেবে আগে কখনও আসেনি। তিনি লিখেছেন, এই ভবিষ্যদ্বাণীর চারটি অংশ: প্রথম রাতে চন্দ্রগ্রহণ, মাঝের দিনে সূর্যগ্রহণ, রমযান মাস, আর একজন প্রত্যাখ্যাত দাবিকারকের উপস্থিতি (তোহফায়ে গোলড়বিয়া, পৃষ্ঠা ২৯)।

তিনি এক হাজার টাকা পুরস্কারের চ্যালেঞ্জও দিয়েছিলেন: ইতিহাস থেকে দেখাও, কেউ আল্লাহর পক্ষ থেকে আসার দাবি করেছে আর তার যুগে রমযানে এভাবে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ হয়েছে (নূরুল হক, ২য় খণ্ড)। কেউ সেই উদাহরণ দেখাতে পারেনি।

হাদীসটি তো মহানবী (সা.) পর্যন্ত পৌঁছায়নি, ইমাম বাকেরের কথা?

হাদীসটির সনদ ইমাম মুহাম্মদ আল-বাকের (রহ.) পর্যন্ত। কিন্তু ভেবে দেখুন: এটি অদৃশ্যের এক সুনির্দিষ্ট খবর, এক হাজার বছর পরের মাস, তারিখ আর ঘটনা। এমন কথা কেউ নিজের মত থেকে বলতে পারেন না। আহলে বাইতের একজন ইমাম তা বলেছেন, এবং সুন্নি ও শিয়া উভয় ধারার বহু গ্রন্থে তা লিপিবদ্ধ হয়েছে।

সবচেয়ে বড় কথা, হাদীসটি সত্য কি না, তার সাক্ষ্য দিয়েছে আকাশ নিজেই। কুরআন বলে, আল্লাহ্ তাঁর অদৃশ্যের বিষয় বহুল পরিমাণে কারও কাছে প্রকাশ করেন না, “কিন্তু এমন রসূল ছাড়া, যাহাকে তিনি মনোনীত করেন” (সূরা আল-জিন্ন ৭২:২৭-২৮)। যে খবর হুবহু পূর্ণ হয়েছে, তা আল্লাহর রসূলেরই খবর। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাই লিখেছেন, এতে কোনো সন্দেহ নেই যে এই হাদীস আল্লাহর রসূল (সা.)-এর।

“প্রথম রাত” মানে তো রমযানের ১ তারিখ, আর “মাঝ” মানে ১৫ তারিখ?

রমযানের ১ তারিখে চন্দ্রগ্রহণ প্রাকৃতিকভাবেই অসম্ভব, কারণ তখন চাঁদ সূর্যের প্রায় একই দিকে থাকে; ১৫ তারিখে সূর্যগ্রহণও অসম্ভব। এমন অর্থ করলে মহানবী (সা.)-এর খবর এমন কিছুর উপর দাঁড়ায়, যা আল্লাহর নিজের বানানো নিয়মের বিরুদ্ধে। কুরআন বলে, “সূর্য ও চন্দ্র হিসাব মোতাবেক (নিজ নিজ কক্ষপথে বিচরণশীল) রহিয়াছে” (সূরা আর-রহমান ৫৫:৬)। হাদীসের কমর শব্দও প্রথম রাতের সরু চাঁদকে বাদ দেয়। তাই সঠিক অর্থ গ্রহণের সম্ভাব্য রাত ও দিনের মধ্যে প্রথম ও মাঝেরটি, আর ঠিক সেটিই ঘটেছে।

সংক্ষেপে

  1. সুনান দারাকুতনীতে মাহদীর দুটি আসমানী নিদর্শনের কথা আছে: রমযানে গ্রহণের প্রথম রাতে চন্দ্রগ্রহণ আর মাঝের দিনে সূর্যগ্রহণ।
  2. ১৩১১ হিজরীর রমযানের ১৩ তারিখে (২১ মার্চ ১৮৯৪) চন্দ্রগ্রহণ আর ২৮ তারিখে (৬ এপ্রিল ১৮৯৪) সূর্যগ্রহণ হয়, ভারতবর্ষ থেকে দৃশ্যমান।
  3. পরের বছর পশ্চিম গোলার্ধে একই তারিখে আবার এই দুই গ্রহণ হয়।
  4. গ্রহণ আগেও হয়েছে, কিন্তু একজন দাবিকারকের উপস্থিতিতে তাঁর সত্যতার নিদর্শন হিসেবে এই প্রথম; আর এর চ্যালেঞ্জের জবাব আজও কেউ দিতে পারেনি।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.