কুরআনের পরে একজন মুসলমানের কাছে সবচেয়ে প্রিয় কথা মহানবী (সা.)-এর বাণী। কুরআন বলেছে, “রসূল তোমাদিগকে যাহা দান করে উহা গ্রহণ কর” (সূরা আল-হাশর ৫৯:৮)। তাই ঈসা (আ.)-এর প্রশ্নে মহানবী (সা.) কী বলেছেন, তা জানা আমাদের জন্য জরুরি।
চলুন হাদীসের কয়েকটি দৃশ্যে যাই। প্রতিটি দৃশ্য আলাদা, কিন্তু সবগুলো একই দিকে ইঙ্গিত করে।
হাদীসের চারটি দৃশ্য
প্রথম দৃশ্য: মিরাজের রাত
মিরাজের রাতে মহানবী (সা.) আকাশের পর আকাশ অতিক্রম করলেন। প্রথম আকাশে দেখা হলো হযরত আদম (আ.)-এর সঙ্গে। তারপর দ্বিতীয় আকাশ। সেখানে কারা ছিলেন?
এই সফরে মহানবী (সা.) আরও দেখলেন ইউসুফ (আ.), ইদরীস (আ.), হারূন (আ.), মূসা (আ.) আর ইবরাহীম (আ.)-কে (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৮৮৭)। এঁরা সবাই বহু আগে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন, তাঁদের রূহ আল্লাহর কাছে।
এখন লক্ষ করুন, ঈসা (আ.) আছেন হযরত ইয়াহইয়া (আ.)-এর সঙ্গে, একই আকাশে, একই অবস্থায়। হযরত ইয়াহইয়া (আ.) যে মারা গেছেন, তা সবাই মানেন। আলইসলাম.অর্গের ভাষায়, ইয়াহইয়া (আ.) যদি মৃত হন, তাহলে ঈসা (আ.)-ও মৃত, কারণ মৃতরা জীবিতদের সঙ্গে একই জগতে থাকেন না।
দ্বিতীয় দৃশ্য: একশো বছরের ঘোষণা
জীবনের শেষ দিকের এক রাত। মহানবী (সা.) ইশার নামায পড়ালেন। সালাম ফিরিয়ে তিনি দাঁড়িয়ে বললেন:
হযরত জাবির (রা.) বর্ণনা করেছেন, মহানবী (সা.) ইন্তেকালের এক মাস আগে কসম খেয়ে বলেছিলেন, পৃথিবীতে আজ যে প্রাণ আছে, একশো বছর পর তাদের কেউ থাকবে না (সহীহ মুসলিম, কিতাবু ফাযায়িলিস সাহাবা, হাদীস ২৫৩৮; ধারাবাহিক গণনায় ৬৪৮১)।
আলইসলাম.অর্গের ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, এর অর্থ সেই সময়ের প্রতিটি জীবিত মানুষ একশো বছরের মধ্যে মারা যাবেন, আর এর মধ্যে ঈসা (আ.)-ও আছেন।
তৃতীয় দৃশ্য: “তাঁরা জীবিত থাকলে…”
তফসীর ইবনে কাসীর ও আল-ইয়াওয়াকীত ওয়াল জাওয়াহিরের মতো গ্রন্থে মহানবী (সা.)-এর একটি উক্তি বর্ণিত হয়েছে, যা আলইসলাম.অর্গে উদ্ধৃত:
এখানে মূসা (আ.) আর ঈসা (আ.)-কে একসঙ্গে রাখা হয়েছে, আর বলা হয়েছে “যদি জীবিত থাকতেন।” মূসা (আ.) যে জীবিত নেই, তা সবাই মানেন। একই বাক্যে ঈসা (আ.)-ও।
চতুর্থ দৃশ্য: একশো বিশ বছর
আলইসলাম.অর্গে উদ্ধৃত আরেকটি বর্ণনায় আছে, জীবনের শেষ অসুস্থতায় মহানবী (সা.) হযরত ফাতিমা (রা.)-কে বলেছিলেন, জিবরাঈল তাঁকে জানিয়েছেন যে ঈসা ইবনে মারইয়াম একশো বিশ বছর জীবিত ছিলেন, আর তাই তিনি মনে করেন তিনি নিজে ষাট বছরের কাছাকাছি বয়সে বিদায় নেবেন। এই বর্ণনা কানযুল উম্মাল ও কাস্তাল্লানীর আল-মাওয়াহিবুল লাদুন্নিয়ার মতো গ্রন্থে আছে বলে আলইসলাম.অর্গে উল্লেখ করা হয়েছে। “জীবিত ছিলেন” কথাটি অতীত কালে, একটি পূর্ণ হয়ে যাওয়া জীবনের হিসাব।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
মিরাজে দেখা মানেই তো প্রমাণ যে ঈসা (আ.) আকাশে আছেন?
এখানে কেউ কেউ বলেন, মহানবী (সা.) তো তাঁকে আকাশেই দেখেছেন, তাহলে তিনি সেখানে জীবিত। চলুন দেখি একই রাতে তিনি আর কাদের দেখেছেন: আদম (আ.), ইউসুফ (আ.), ইদরীস (আ.), হারূন (আ.), মূসা (আ.), ইবরাহীম (আ.)। এঁদের কেউ সশরীরে আকাশে জীবিত নন, তাঁদের দেহ পৃথিবীতে সমাহিত। মিরাজে যা দেখা হয়েছে, তা ছিল রূহের জগৎ। সেই জগতে ঈসা (আ.)-কে পাওয়া গেছে মৃত নবীদের মাঝে, আর বিশেষ করে মৃত ইয়াহইয়া (আ.)-এর পাশে। যদি তিনি একমাত্র সশরীরে জীবিত হতেন, মহানবী (সা.) নিশ্চয় সেই বিশেষত্বের কথা বলতেন।
একশো বছরের হাদীস তো শুধু পৃথিবীর মানুষের জন্য; ঈসা (আ.) তো আকাশে?
প্রশ্নটি যুক্তিসংগত, তাই কুরআনের দিকে তাকাই। আল্লাহ মানুষ সম্পর্কে বলেছেন, “তোমরা ইহাতে জীবন ধারণ করিবে এবং এখানেই তোমরা মৃত্যু বরণ করিবে এবং এখান হইতে তোমাদিগকে বাহির করা হইবে” (সূরা আল-আ’রাফ ৭:২৬)। মানুষের জীবন আর মৃত্যুর জায়গা এই পৃথিবী। আকাশে সশরীরে বাস করা মানুষের জন্য আল্লাহর নিয়ম নয় (১৭:৯৪)। তাই সেই রাতে যিনিই সশরীরে জীবিত ছিলেন, তিনি পৃথিবীতেই ছিলেন, আর মহানবী (সা.)-এর ঘোষণার আওতায় পড়েন।
“মূসা ও ঈসা জীবিত থাকলে” হাদীসটি তো বুখারীতে নেই?
ঠিক, এটি সহীহ বুখারীর হাদীস নয়, তফসীর ও অন্যান্য গ্রন্থের বর্ণনা। তাই আমরা এটিকে মূল ভিত্তি বানাইনি। মূল প্রমাণ কুরআনের আয়াত আর সহীহ বুখারীর হাদীস: কিয়ামতে মহানবী (সা.)-এর মুখে ঈসা (আ.)-এর “ফালাম্মা তাওয়াফ্ফাইতানী” (হাদীস ৪৬২৫), মিরাজে মৃত নবীদের মাঝে ঈসা (আ.) (হাদীস ৩৪৩০), আর একশো বছরের ঘোষণা (হাদীস ১১৬)। এই বর্ণনাটি শুধু দেখায় যে পূর্ববর্তী আলেমদের গ্রন্থেও একই কথা সংরক্ষিত ছিল।
তাহলে ঈসা ইবনে মারইয়ামের নেমে আসার হাদীসগুলোর অর্থ কী?
কেউ জিজ্ঞেস করেন, এত প্রমাণ থাকলে নুযূলের হাদীসগুলো কোথায় যাবে? উত্তর হাদীসের ভেতরেই। মহানবী (সা.) বলেছেন, “তোমাদের অবস্থা কেমন হবে, যখন ইবনে মারইয়াম তোমাদের মধ্যে নাযিল হবেন আর তোমাদের ইমাম হবেন তোমাদেরই মধ্য থেকে” (সহীহ বুখারী, হাদীস ৩৪৪৯)। আর তিনি দুই ঈসার দুই রকম চেহারা বর্ণনা করেছেন: মিরাজে দেখা ঈসা (আ.) লালচে রঙের, কোঁকড়া চুলের (হাদীস ৩৪৩৮); আর শেষ যুগের দৃশ্যে দেখা মসীহ বাদামি রঙের, সোজা চুলের (হাদীস ৩৪৪১)। দুই চেহারা মানে দুইজন মানুষ। যিনি আসার কথা, তিনি এই উম্মতের একজন, ঈসা (আ.)-এর গুণ নিয়ে আসা মসীহ। এ বিষয়ে আমাদের আলাদা লেখা আছে।
সংক্ষেপে
- মিরাজে মহানবী (সা.) ঈসা (আ.)-কে দেখেছেন মৃত নবী ইয়াহইয়া (আ.)-এর সঙ্গে, রূহের জগতে।
- মহানবী (সা.) ঘোষণা দিয়েছেন, সেই সময়ের কোনো জীবিত মানুষ একশো বছর পরে থাকবে না।
- কুরআন বলছে, মানুষের জীবন ও মৃত্যুর স্থান এই পৃথিবী; আকাশে সশরীরে বাস মানুষের নিয়ম নয়।
- তফসীর গ্রন্থে বর্ণিত “মূসা ও ঈসা জীবিত থাকলে” উক্তিও একই সত্যের দিকে ইঙ্গিত করে।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Death of Hazrat Jesus (as) · alislam.org
- 30 Verses of the Holy Quran which prove the Natural Death of Jesus Christ (as) · alislam.org
- Death and “Ascension” of Hazrat Jesus (as), Son of Mary · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.