আল্লাহ কি আজও মানুষের সঙ্গে কথা বলেন?

আল্লাহ মৌমাছিকে ওহী করেছেন, মূসা (আ.)-এর মাকে ওহী করেছেন। তাহলে শ্রেষ্ঠ উম্মতের জন্য কি সেই দরজা চিরতরে বন্ধ?

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

নীল নদের পাড়ে এক ভয়ার্ত মা। ফেরাউনের সৈন্যরা ইসরাঈলী ছেলেশিশুদের খুঁজে খুঁজে হত্যা করছে। তাঁর কোলে সদ্যোজাত শিশু মূসা। কী করবেন তিনি? ঠিক তখন আল্লাহ তাঁকে পথ দেখালেন।

وَاَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰۤی اُمِّ مُوۡسٰۤی اَنۡ اَرۡضِعِیۡہِ
“এবং আমরা মূসার মাতার প্রতি ওহী করিয়াছিলাম যে, ‘তুমি তাহাকে দুধ পান করাইতে থাক এবং যখন তাহার সম্বন্ধে তোমার আশঙ্কা হইবে তখন তুমি তাহাকে নদীতে ফেলিয়া দিও এবং তুমি ভয় করিও না এবং চিন্তিত ও দুঃখিত হইও না;…’”
সূরা আল-কাসাস ২৮:৮
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২৮:৭।

মূসা (আ.)-এর মা নবী ছিলেন না। তবু আল্লাহ তাঁর সঙ্গে কথা বলেছেন। কুরআন জানায়, আল্লাহ ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীদের প্রতিও ওহী করেছিলেন (সূরা আল-মায়েদা ৫:১১২), এমনকি মৌমাছিকেও (সূরা আন-নাহল ১৬:৬৯)।

প্রশ্নটি তাই খুব সহজ

বনী ইসরাঈলের এক মা ওহী পেয়েছেন, হাওয়ারীরা ওহী পেয়েছেন। তাহলে কুরআন যাকে “শ্রেষ্ঠ উম্মত” বলেছে (সূরা আলে ইমরান ৩:১১১), সেই মুহাম্মদ (সা.)-এর উম্মত কি এই নিয়ামত থেকে চিরতরে বঞ্চিত? আল্লাহর কোনো গুণ তো কখনো অচল হয় না। তিনি আগে শুনতেন, আজও শোনেন। আগে কথা বলতেন, তাহলে আজ কেন বলবেন না?

আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যা স্পষ্ট: কুরআন পরিপূর্ণ শরীয়ত, তাই নতুন শরীয়তের ওহী আর আসবে না। কিন্তু শরীয়তবিহীন ওহীর দরজা সত্যিকারের মুসলমানদের জন্য খোলা থাকবে।

কুরআনের প্রতিশ্রুতি

اِنَّ الَّذِیۡنَ قَالُوۡا رَبُّنَا اللّٰہُ ثُمَّ اسۡتَقَامُوۡا تَتَنَزَّلُ عَلَیۡہِمُ الۡمَلٰٓئِکَۃُ اَلَّا تَخَافُوۡا وَلَا تَحۡزَنُوۡا
“নিশ্চয় যাহারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্’, অতঃপর তাহারা দৃঢ়তার সহিত অবিচল থাকে, তাহাদের উপর ফিরিশ্‌তাগণ নাযেল হয় (এই বলিয়া), ‘তোমরা ভয় করিও না, এবং দুঃখিত হইও না…’”
সূরা হা-মীম আস-সাজদা ৪১:৩১

এটি কোনো অতীত কাহিনি নয়, একটি স্থায়ী নিয়ম। যে-ই আল্লাহকে প্রভু মেনে অবিচল থাকবে, তার উপর ফিরিশতারা নামবেন, সান্ত্বনার বাণী নিয়ে। পরের আয়াতে ফিরিশতারা বলেন, “আমরা তোমাদের বন্ধু— ইহজীবনেও এবং পরজীবনেও।”

আল্লাহ মানুষের সঙ্গে কীভাবে কথা বলেন, তাও কুরআন জানিয়েছে:

وَمَا کَانَ لِبَشَرٍ اَنۡ یُّکَلِّمَہُ اللّٰہُ اِلَّا وَحۡیًا اَوۡ مِنۡ وَّرَآیِٔ حِجَابٍ اَوۡ یُرۡسِلَ رَسُوۡلًا
“এবং কোন মানুষের পক্ষে সম্ভব নহে যে, আল্লাহ্ তাঁহার সঙ্গে বাক্যালাপ করিবেন— কিন্তু কেবল ওহীযোগে অথবা পর্দার অন্তরাল হইতে অথবা এমন দূত প্রেরণ করিয়া যে তাঁহার আদেশানুযায়ী উহা ওহী করে যাহা তিনি চাহেন।…”
সূরা আশ-শূরা ৪২:৫২
✦

মহানবী (সা.) যা রেখে গেছেন

হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, তিনি রসূলুল্লাহ (সা.)-কে বলতে শুনেছেন:

لَمْ يَبْقَ مِنَ النُّبُوَّةِ إِلاَّ الْمُبَشِّرَاتُ ‏.‏ قَالُوا وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ قَالَ الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ
“নবুয়্যতের মধ্য থেকে মুবাশশিরাত ছাড়া আর কিছু বাকি থাকেনি।” সাহাবীরা জিজ্ঞেস করলেন, মুবাশশিরাত কী? তিনি বললেন, “সৎ স্বপ্ন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাবীর, হাদীস ৬৯৯০

লক্ষ করুন, মহানবী (সা.) মুবাশশিরাতকে নবুয়্যতেরই অংশ বলেছেন। অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন, মু’মিনের স্বপ্ন নবুয়্যতের ছেচল্লিশ ভাগের এক ভাগ (সহীহ বুখারী, হাদীস ৬৯৯৪)। অর্থাৎ নবুয়্যতের একটি অংশ তাঁর উম্মতে চলমান।

শেষ যুগের মসীহ সম্পর্কে সহীহ মুসলিমের কিতাবুল ফিতানে হযরত নাওয়াস বিন সামআন (রা.)-এর বর্ণনায় আছে: ইয আওহাল্লাহু ইলা ঈসা, “তখন আল্লাহ ঈসার প্রতি ওহী করবেন।” অর্থাৎ বিরোধী আলেমরাও মানেন, মহানবী (সা.)-এর পরে অন্তত একজনের উপর ওহী নামবে।

আলইসলাম ডট অর্গে মহানবী (সা.)-এর পরের ত্রিশজন বুযুর্গের নাম দেওয়া হয়েছে, যাঁরা আল্লাহর বাক্যালাপের সৌভাগ্য পেয়েছেন বলে জানা যায়, যেমন হযরত জুনায়েদ বাগদাদী, ইমাম আবু হানীফা, ইমাম শাফেয়ী ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল (রহ.)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

তিরমিযীর হাদীসেই তো আছে, রিসালাত ও নবুয়্যত বন্ধ হয়ে গেছে?

হাদীসটি পুরোটা পড়ুন। হযরত আনাস বিন মালিক (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বললেন, রিসালাত ও নবুয়্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে, আমার পরে কোনো রসূল নেই, নবীও নেই। কথাটি মানুষের কাছে কঠিন লাগল। তখন তিনি বললেন:

لَكِنِ الْمُبَشِّرَاتُ ‏.‏ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَا الْمُبَشِّرَاتُ قَالَ رُؤْيَا الْمُسْلِمِ وَهِيَ جُزْءٌ مِنْ أَجْزَاءِ النُّبُوَّةِ
“তবে মুবাশশিরাত (থাকবে)।” তাঁরা বললেন, হে আল্লাহর রসূল, মুবাশশিরাত কী? তিনি বললেন, “মুসলমানের স্বপ্ন, আর তা নবুয়্যতের অংশগুলোর একটি অংশ।”
জামে তিরমিযী, আবওয়াবুর রুইয়া, হাদীস ২২৭২

একই হাদীসে মহানবী (সা.) নিজেই জানিয়ে দিলেন, নবুয়্যতের একটি অংশ থেকে যাবে। তাহলে “বন্ধ” মানে সব কিছু বন্ধ নয়। শায়খ ইবনে আরাবী (রহ.) ঠিক এই ধরনের হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেন, শেষ হয়েছে শুধু নতুন শরীয়ত নিয়ে আসা নবুয়্যত।

“ওহী তো মহানবী (সা.)-এর মৃত্যুর সঙ্গে বন্ধ”, এমন হাদীস কি নেই?

“লা ওয়াহইয়া বা’দা মাওতী”, অর্থাৎ “আমার মৃত্যুর পরে কোনো ওহী নেই”, এই কথাটি প্রায়ই শোনা যায়। কিন্তু আহলে হাদীস আলেম নওয়াব নূরুল হাসান খান লিখেছেন, এই তথাকথিত হাদীস ভিত্তিহীন (ইকতিরাবুস সাআ, পৃষ্ঠা ১৬২)। ভিত্তিহীন বর্ণনা দিয়ে কুরআনের স্থায়ী প্রতিশ্রুতি বাতিল করা যায় না।

কারো উপর ওহী নামলেই কি সে নবী হয়ে যায়?

না, আর আহমদী মুসলমানরাও তা বলেন না। মূসা (আ.)-এর মা নবী ছিলেন না। কুরআন বলে, আল্লাহ অদৃশ্যের বিষয় বহুল পরিমাণে প্রকাশ করেন শুধু তাঁর মনোনীত রসূলের উপর:

فَلَا یُظۡہِرُ عَلٰی غَیۡبِہٖۤ اَحَدًا اِلَّا مَنِ ارۡتَضٰی مِنۡ رَّسُوۡلٍ
“…অতএব তিনি কাহারও উপর অদৃশ্য বিষয়সমূহ বহুল পরিমাণে প্রকাশ করেন না, কিন্তু এমন রসূল ছাড়া, যাহাকে তিনি মনোনীত করেন।…”
সূরা আল-জিন্ন ৭২:২৭–২৮

সাধারণ মু’মিন সত্য স্বপ্ন ও ইলহাম পান। কিন্তু যাঁকে আল্লাহ বহুল পরিমাণে অদৃশ্যের খবর দেন এবং নিজে নবী নাম দেন, তিনিই এই উম্মতে উম্মতী নবীর মর্যাদা পান, আর তাও মহানবী (সা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমে।

সংক্ষেপে

  1. কুরআন অনুযায়ী আল্লাহ নবী নন এমন মানুষের প্রতিও ওহী করেছেন: মূসা (আ.)-এর মা, ঈসা (আ.)-এর হাওয়ারীরা।
  2. ৪১:৩১ আয়াতের প্রতিশ্রুতি স্থায়ী: অবিচল মু’মিনদের উপর ফিরিশতারা নামেন।
  3. মহানবী (সা.) বলেছেন, নবুয়্যতের অংশ “মুবাশশিরাত” তাঁর পরেও থাকবে (বুখারী ৬৯৯০, তিরমিযী ২২৭২)।
  4. বন্ধ হয়েছে শুধু শরীয়তের ওহী; “আমার মৃত্যুর পরে ওহী নেই” বর্ণনাটিকে আলেমরাই ভিত্তিহীন বলেছেন।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.