হিজরতের আগের কথা। মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখলেন, তিনি মক্কা থেকে এমন এক দেশে হিজরত করছেন যেখানে খেজুরবাগান আছে। তাঁর মনে হলো জায়গাটি হয়তো ইয়ামামা, কিংবা হাজার। পরে দেখা গেল, সেটি ছিল মদীনা।
স্বপ্ন সত্য ছিল। কিন্তু স্বপ্নের ব্যাখ্যায় প্রথম ধারণাটি মেলেনি। এই ছোট্ট ঘটনাটি মহানবী (সা.) নিজেই বর্ণনা করেছেন। আজকের আপত্তির পুরো উত্তর এর ভেতরেই আছে।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর হাকীকাতুল ওহী (রূহানী খাযায়েন ২২ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৫৭৩) থেকে উদ্ধৃতি দেওয়া হয়: দুনিয়ায় এমন কোনো নবী আসেননি যিনি ইজতেহাদী ভুলের শিকার হননি। বিরোধীরা বলেন, এতে নবীদের, বিশেষ করে মহানবী (সা.)-এর অবমাননা হয়েছে।
“ইজতেহাদ” মানে কী?
ইজতেহাদ মানে নিজের বিবেচনা খাটিয়ে কোনো বিষয় বোঝার চেষ্টা। ওহী হলো আল্লাহর বাণী। ইজতেহাদ হলো সেই বাণী বা কোনো পরিস্থিতি সম্পর্কে মানুষের নিজের বোঝা। প্রথমটিতে ভুল নেই; দ্বিতীয়টিতে মানুষ হিসেবে ভুল হতে পারে।
হাকীকাতুল ওহীর পুরো অনুচ্ছেদটির মর্ম এমন: “ইজতেহাদের ব্যাপারে আমার বিশ্বাস হলো, পৃথিবীতে এমন কোনো নবী আসেননি যাঁর ইজতেহাদে কখনো ভুল হয়নি। যখন নবীগণের শ্রেষ্ঠ (সা.)-ও ইজতেহাদী ভুল থেকে মুক্ত ছিলেন না, যেমন হুদায়বিয়ার সফর, যেমন ইয়ামামায় হিজরতের ধারণা, তখন অন্যদের ব্যাপারে আপত্তি কেন? নবী তাঁর বিবেচনায় ভুল করতে পারেন, কিন্তু আল্লাহর ওহীতে এমন কোনো ভুল থাকে না।… আল্লাহ নবীদের ইজতেহাদী ভুলের সুযোগ রেখেছেন, যেন মানুষ তাঁদের খোদা বানিয়ে না ফেলে; কিন্তু এতে তাঁদের পরিপূর্ণ সত্যতায় কোনো আঁচড় পড়ে না, কারণ তাঁদের সত্যতা প্রমাণিত হয় অগণিত নিদর্শন দিয়ে।”
এই অনুচ্ছেদ লেখা হয়েছিল একটি নির্দিষ্ট অভিযোগের জবাবে। এক সমালোচক বলেছিলেন, তাঁর একটি ভবিষ্যদ্বাণী নিয়ে তাঁর নিজের অনুমান মেলেনি। তিনি উত্তরে দেখিয়েছেন, ভবিষ্যদ্বাণীর ব্যাখ্যায় অনুমান মিলতে না পারা নবীদের ইতিহাসেও ঘটেছে, আর তাতে ওহী মিথ্যা হয় না।
মহানবী (সা.) নিজে কী বলেছেন?
হিজরতের স্বপ্নের কথা সহীহ বুখারীতে মহানবী (সা.)-এর নিজের ভাষায় আছে:
আরেকটি ঘটনা সহীহ মুসলিমে। মদীনায় লোকেরা খেজুর গাছে পরাগায়ন করছিল। মহানবী (সা.) বললেন, না করলেও হয়তো ভালো হতো। তারা ছেড়ে দিল, ফলন খারাপ হলো। তখন তিনি বললেন:
মহানবী (সা.) নিজে খোলাখুলি এই পার্থক্য শিখিয়েছেন: আল্লাহর ওহী এক জিনিস, আর পার্থিব বিষয়ে তাঁর ব্যক্তিগত মত আরেক জিনিস।
কুরআনের সাক্ষ্য
কুরআন মহানবী (সা.)-কে দিয়ে ঘোষণা করিয়েছে:
অদৃশ্যের পূর্ণ জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর। নবী ততটুকুই জানেন, যতটুকু আল্লাহ জানান। যেখানে আল্লাহ বিস্তারিত জানাননি, সেখানে নবী নিজের বিবেচনায় চলেন, আর সেখানে মানুষ হিসেবে তাঁর ধারণা সবসময় ঘটনার সাথে হুবহু না-ও মিলতে পারে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
নবীর ভুল হতে পারলে তাঁর কোন কথা বিশ্বাস করব?
এটাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, আর এর উত্তর হাকীকাতুল ওহীর সেই অনুচ্ছেদেই আছে: ভুল হতে পারে নবীর নিজের বিবেচনায়, আল্লাহর ওহীতে নয়। কুরআন মহানবী (সা.) সম্পর্কে বলে, “এবং সে নিজ প্রবৃত্তির বশেও কথা বলে না। ইহা কেবল এমন ওহী যাহা (আল্লাহ্র সমীপ হইতে) ওহী করা হইতেছে” (সূরা আন-নাজম ৫৩:৪-৫)। দ্বীন আর শরীয়তের যা কিছু ওহীর মাধ্যমে এসেছে, তা নির্ভুল। খেজুর গাছের পরাগায়ন নিয়ে ব্যক্তিগত মত সেই শ্রেণির নয়, মহানবী (সা.) নিজেই তা জানিয়ে দিয়েছেন।
হুদায়বিয়ার ঘটনাকে “ভুল” বলা কি বেয়াদবি নয়?
মহানবী (সা.) স্বপ্নে দেখেছিলেন, মুসলমানরা নিরাপদে মসজিদুল হারামে প্রবেশ করছেন। তিনি সাহাবীদের নিয়ে উমরার জন্য রওনা হলেন, কিন্তু সে বছর ঢুকতে পারলেন না; হুদায়বিয়ায় সন্ধি হলো। কুরআন তখন বলল:
স্বপ্ন সত্য, প্রতিশ্রুতি সত্য; শুধু সময়টি তখনই ছিল না। “আল্লাহ্ উহা জানিতেন যাহা তোমরা জানিতে না।” এটি কুরআনের নিজের বর্ণনা। একে “ইজতেহাদী ভুল” বলা মানে এটুকুই বলা যে, সময় সম্পর্কে ধারণাটি মানুষের ছিল, আল্লাহর নয়। এতে কোনো অবমাননা নেই।
নবীরা তো মাসুম (নিষ্পাপ); ভুল কীভাবে হয়?
মাসুম মানে পাপ থেকে সুরক্ষিত। বিবেচনার ভুল পাপ নয়। খেজুর গাছের ঘটনায় বা হিজরতের স্থান অনুমানে কোনো গুনাহ ছিল না। আহমদীয়া মুসলিম জামাত নবীদের নিষ্পাপ বলেই বিশ্বাস করে। হাকীকাতুল ওহীতে তিনি লিখেছেন, ইজতেহাদী ভুল নবীদের পরিপূর্ণ সত্যতা থেকে কিছুই কমায় না।
সব মিলিয়ে: “তুমি বল, ‘আমিতো তোমাদেরই মত একজন মানুষ, (কিন্তু) আমার প্রতি এই ওহী করা হয়…’” (সূরা আল-কাহফ ১৮:১১১)। নবী মানুষ, আর তাঁর কাছে আসে আল্লাহর ওহী। এই দুই সত্য একসাথে মানলে আপত্তি থাকে না। আল্লাহ এভাবেই নবীদের মর্যাদা রেখেছেন, আবার তাঁদের খোদা বানানোর পথও বন্ধ করেছেন।
সংক্ষেপে
- ইজতেহাদ মানে নবীর নিজের বিবেচনা; ভুলের সম্ভাবনা কেবল সেখানে, আল্লাহর ওহীতে নয়।
- মহানবী (সা.) নিজেই হিজরতের স্থান সম্পর্কে তাঁর প্রথম ধারণার কথা বলেছেন (বুখারী ৩৬২২) এবং বলেছেন “তোমাদের দুনিয়াবি বিষয় তোমরাই ভালো জানো” (মুসলিম ২৩৬৩)।
- হুদায়বিয়ার ব্যাপারে কুরআন বলেছে, স্বপ্ন সত্য, তবে আল্লাহ জানতেন যা মানুষ জানত না (৪৮:২৮)।
- হাকীকাতুল ওহী অনুযায়ী আল্লাহ এ সুযোগ রেখেছেন যেন মানুষ নবীদের খোদা না বানায়; এতে তাঁদের সত্যতা কমে না।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Haqiqatul-Wahi (The Philosophy of Divine Revelation) · alislam.org
- Haqiqatul-Wahi (English, PDF) · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.