মদিনার মসজিদ। মহানবী (সা.)-এর চারপাশে সাহাবীরা বসে আছেন। তাঁদের মধ্যে আছেন পারস্য থেকে আসা হযরত সালমান ফারসী (রা.), যিনি সত্যের খোঁজে দেশ-দেশান্তর ঘুরে শেষে মদিনায় এসে পৌঁছেছিলেন।
এমন সময় সূরা জুমুআ নাযিল হলো। মহানবী (সা.) আয়াতগুলো পড়লেন। একটি আয়াতে এসে হযরত আবু হুরায়রা (রা.) থমকে গেলেন। প্রশ্ন জাগল মনে। আর সেই প্রশ্নের উত্তর আজও আমাদের সামনে একটি বড় সত্য খুলে দেয়।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখেছেন, একটি হাদীসে আছে যে শেষ যুগে মহানবী (সা.) আবার দুনিয়ায় আসবেন (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৮, পৃষ্ঠা ৩৮৪, টীকা)। বিরোধীরা জানতে চান, এমন কথা কোন হাদীসে আছে?
আয়াতটি কী বলে
সূরা জুমুআর শুরুতে আল্লাহ তাআলা মহানবী (সা.)-এর প্রথম আবির্ভাবের কথা বলেছেন:
তারপর পরের আয়াত:
অর্থাৎ একই রসূলকে আল্লাহ আরেকটি দলের মধ্যেও আবির্ভূত করবেন, যারা তখনো সাহাবীদের সাথে মিলিত হয়নি, অর্থাৎ পরের কোনো যুগের মানুষ। এটিই মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আবির্ভাবের ঘোষণা।
সাহাবীর প্রশ্ন, নবীর উত্তর
এই আয়াত শুনেই হযরত আবু হুরায়রা (রা.) জিজ্ঞেস করেছিলেন। তিনি নিজেই ঘটনাটি বর্ণনা করেছেন:
এখানে তিনটি কথা লক্ষ করুন। এক, প্রশ্নটি ছিল “আখারীনা মিনহুম”, অর্থাৎ সেই পরবর্তী দলের মধ্যে রসূলের আবির্ভাব নিয়ে। দুই, উত্তরে মহানবী (সা.) নিজের সশরীরে ফিরে আসার কথা বলেননি; তিনি পারস্য বংশের একজন মানুষের দিকে ইশারা করেছেন। তিন, সময়টি হবে যখন ঈমান পৃথিবী থেকে উঠে গিয়ে যেন সুদূর নক্ষত্রে পৌঁছে যাবে।
তাহলে মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন হবে এভাবে: তাঁর এক নিবেদিতপ্রাণ অনুসারী, তাঁর রঙে রঙিন হয়ে, ঈমানহীন যুগে ঈমান ফিরিয়ে আনবেন। ব্যাখ্যাও তাই: এটি মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন, যা রূপক অর্থে প্রতিশ্রুত মসীহের মাধ্যমে পূর্ণ হয়েছে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“হাদীসে তো ‘আবার আসবেন’ শব্দগুলো নেই”
এখানে কেউ কেউ বলেন, হুবহু বাক্যটি না থাকলে দাবিটি ভুল। কিন্তু হাদীসটি একা পড়ার জিনিস নয়; এটি একটি আয়াতের ব্যাখ্যা। আয়াত বলছে, আল্লাহ সেই রসূলকে পরবর্তী লোকদের মধ্যেও আবির্ভূত করবেন। সাহাবী জানতে চাইলেন তারা কারা। মহানবী (সা.) উত্তর দিলেন। প্রশ্ন আর উত্তর মিলিয়ে পড়লে কথাটি পরিষ্কার: শেষ যুগে রসূলের আবির্ভাব ঘটবে পারস্য বংশের একজনের মাধ্যমে। হাদীসের বর্ণনাকে আয়াতসহ পড়াই সঠিক পদ্ধতি।
“তাহলে কি খাতামান নাবিয়্যীনের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হয়?”
একেবারেই না, বরং মর্যাদা আরও উজ্জ্বল হয়। কুরআন মহানবী (সা.)-কে বলেছে “আল্লাহ্র রসূল এবং নবীগণের মোহর” (সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১)। এই দ্বিতীয় আবির্ভাব কোনো নতুন শরীয়ত বা স্বাধীন নবুয়ত নয়। যিনি আসবেন, তিনি মহানবী (সা.)-এরই অনুসারী, তাঁর কুরআন আর তাঁর সুন্নতের সেবক। হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.) এক সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট বলেছেন, শেষ শরীয়ত, শেষ কিতাব আর অনুসরণযোগ্য শেষ নেতা হলেন মহানবী (সা.); তাঁর অধীন কেউ স্বাধীন নবী হতে পারেন না। শিষ্যের আগমন আসলে গুরুর কল্যাণেরই প্রকাশ।
“পারস্য বংশের মানুষ তো অনেক, হযরত মির্যা সাহেবই কেন?”
দুটি কারণে। প্রথমত, হাদীসের শর্ত হলো ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে চলে যাওয়ার যুগ; চতুর্দশ হিজরী শতাব্দীতে মুসলমানদের অধঃপতন সেই অবস্থার সবচেয়ে বড় উদাহরণ। দ্বিতীয়ত, হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ওপর বারাহীনে আহমদীয়াতে প্রকাশিত ইলহামেই এই হাদীসের বাক্যটি এসেছিল, যে ঈমান সুরাইয়ায় চলে গেলেও পারস্য বংশের একজন তা ফিরিয়ে আনবে। আর এই সময়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে এই কাজের দাবি নিয়ে দাঁড়িয়েছেন একজনই।
তাই আপত্তিটি টেকে না। মহানবী (সা.)-এর শেষ যুগে “আগমন” কথাটির ভিত্তি সূরা জুমুআ আর সহীহ বুখারীর হাদীস; আর এর অর্থ সশরীরে ফিরে আসা নয়, বরং তাঁর এক পরিপূর্ণ অনুসারীর মাধ্যমে তাঁর আধ্যাত্মিক কল্যাণের পুনঃপ্রকাশ।
সংক্ষেপে
- সূরা জুমুআ (৬২:৩–৪) বলে, আল্লাহ একই রসূলকে পরবর্তী লোকদের মধ্যেও আবির্ভূত করবেন।
- সহীহ বুখারী (৪৮৯৭): এই আয়াত সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তরে মহানবী (সা.) সালমান ফারসী (রা.)-এর ওপর হাত রেখে পারস্য বংশের এক ব্যক্তির কথা বলেছেন।
- এই দ্বিতীয় আগমন রূপক; এটি মহানবী (সা.)-এর এক অনুসারীর মাধ্যমে, যা খাতামান নাবিয়্যীনের মর্যাদারই প্রকাশ।
- হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) এই আয়াত ও হাদীসের ভিত্তিতেই কথাটি লিখেছেন।
আরও পড়তে চাইলেFurther reading
- Establishing the Truthfulness of the Promised Messiah (as) from the Holy Quran · alislam.org
- Hazrat Mirza Ghulam Ahmad – The Promised Messiah · alislam.org
- Claims of the Promised Messiah · alislam.org
- এই বিষয়ে আরও দলিল · alimammahdi.wordpress.com
কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.