“আমি শেষ নবী, তোমরা শেষ উম্মত”: একই হাদীসে লুকিয়ে আছে উত্তর

এই বাক্যটি দিয়ে বলা হয়, মহানবী (সা.)-এর পরে কোনো নবীর প্রশ্নই ওঠে না। কিন্তু হাদীসটি পুরোটা পড়লে দেখা যায়, এর পরেই সেখানে এক আগমনকারীর বর্ণনা আছে।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

সুনান ইবনে মাজাহর ফিতনা-অধ্যায়ে একটি দীর্ঘ হাদীস আছে। মহানবী (সা.) সাহাবীদের দাজ্জালের ফিতনা সম্পর্কে সতর্ক করছেন। তিনি বলছেন, আদম (আ.)-এর সন্তানদের জন্য দাজ্জালের ফিতনার চেয়ে বড় ফিতনা আর নেই, আর প্রত্যেক নবী তাঁর উম্মতকে এ বিষয়ে সাবধান করেছেন। তারপর বলছেন:

وَأَنَا آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَأَنْتُمْ آخِرُ الأُمَمِ وَهُوَ خَارِجٌ فِيكُمْ لاَ مَحَالَةَ
“আর আমি শেষ নবী, তোমরা শেষ উম্মত; আর সে (দাজ্জাল) অবশ্যই তোমাদের মধ্যে বের হবে।”
সুনান ইবনে মাজাহ, কিতাবুল ফিতান, দাজ্জালের ফিতনা ও ঈসা ইবনে মারইয়ামের আগমন-বিষয়ক অধ্যায়, হাদীস ৪০৭৭

বিরোধী আলেমরা প্রথম বাক্যটি আলাদা করে উদ্ধৃত করেন: “আমি শেষ নবী।” তাঁদের মতে এর পর আর ব্যাখ্যার কিছু থাকে না।

পুরো হাদীসটি কী বলে

কিন্তু হাদীসটি সেখানে শেষ হয়নি। একটু পরেই একই হাদীসে মহানবী (সা.) বলছেন, সেদিন মুসলমানরা বায়তুল মাকদিসে থাকবে, তাদের ইমাম একজন সৎ মানুষ। ইমাম যখন ফজরের নামায পড়াতে এগোবেন, তখন তাদের মাঝে নেমে আসবেন ঈসা ইবনে মারইয়াম। ইমাম পিছিয়ে আসতে চাইবেন, আর ঈসা তাঁর কাঁধে হাত রেখে বলবেন, “আপনিই এগিয়ে যান, এই নামায আপনার জন্যই দাঁড়ানো হয়েছে।”

এবার ভাবুন। যে হাদীসে মহানবী (সা.) বলছেন “আমি শেষ নবী”, সেই একই হাদীসে তিনি শেষ যুগে মসীহের আগমনের বর্ণনা দিচ্ছেন। তাঁর নিজের কাছে এই দুই কথার মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তাহলে “শেষ নবী” কথাটির অর্থ কখনোই এটা হতে পারে না যে তাঁর পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে কোনো আগমনকারী আসবেন না।

আর সহীহ মুসলিমে সেই আগমনকারীকে তিনি চারবার বলেছেন “আল্লাহর নবী ঈসা” (কিতাবুল ফিতান)।

“শেষ” শব্দের আরেকটি দৃষ্টান্ত

মহানবী (সা.) আরেকটি হাদীসে একই শব্দ ব্যবহার করেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন:

فَإِنِّي آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّهُ آخِرُ الْمَسَاجِدِ
“নিশ্চয় আমি শেষ নবী, আর এটি (আমার মসজিদ) শেষ মসজিদ।”
সুনান নাসাঈ, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস ৬৯৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হজ্জেও বর্ণিত

আলইসলাম ডট অর্গের ব্যাখ্যায়: এর অর্থ যদি হয় আর কোনো মসজিদ বানানো যাবে না, তাহলে মুসলমানরা আর কোনো মসজিদই বানাতে পারত না। স্পষ্টতই অর্থ হলো, তাঁর আনা দ্বীন পূর্ণ; কেউ তা বাতিল বা বদলাতে পারবে না। পৃথিবীর সব মসজিদ যেমন মসজিদে নববীর অনুসরণে, তেমনি তাঁর পরের সব আধ্যাত্মিক মর্যাদা তাঁরই অনুসরণে।

✦

“শেষ উম্মত” মানে কী

“তোমরা শেষ উম্মত” কথাটিও একই আলোয় পড়ুন। মহানবী (সা.)-এর পরে আর কোনো নতুন উম্মত গড়ে উঠবে না, কোনো নতুন শরীয়তকে কেন্দ্র করে আলাদা কোনো জাতি তৈরি হবে না। আহমদী মুসলমানরা এ কথা পুরোপুরি মানেন।

উম্মতী নবী নতুন উম্মত তৈরি করেন না। তিনি নিজেই এই উম্মতের সদস্য। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন: শরীয়তবিহীন নবী আসতে পারেন, কিন্তু তাঁকে প্রথমে উম্মতী হতে হবে; এই অর্থে আমি উম্মতীও, নবীও (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়্যা, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪১১–৪১২)। আর কুরআনের প্রতিশ্রুতিও এই উম্মতের জন্যই:

وَمَنۡ یُّطِعِ اللّٰہَ وَالرَّسُوۡلَ فَاُولٰٓئِکَ مَعَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ مِّنَ النَّبِیّٖنَ
“এবং যাহারা আল্লাহ্ এবং এই রসূলের আনুগত্য করিবে তাহারা ঐ সকল লোকদের মধ্যে শামিল হইবে যাহাদিগকে আল্লাহ্ পুরস্কার দান করিয়াছেন অর্থাৎ নবীগণ…”
সূরা আন-নিসা ৪:৭০
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৪:৬৯।

এভাবে দেখলে “শেষ উম্মত” কথাটি এক বড় সম্মানের ঘোষণা। পৃথিবীর শেষ দিন পর্যন্ত এই উম্মতই আল্লাহর শেষ ও পূর্ণ বাণীর বাহক। আল্লাহ এই উম্মতকে বাদ দিয়ে অন্য কোনো জাতিকে নতুন শরীয়ত দেবেন না। আর যখনই এই উম্মতের সংস্কারের প্রয়োজন হবে, আল্লাহ এই উম্মতের ভেতর থেকেই মানুষ দাঁড় করাবেন। শেষ যুগের সবচেয়ে বড় সংস্কারকও এর ব্যতিক্রম নন।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

হাদীসটি তো সুনান গ্রন্থে আছে; একে কি পুরোপুরি দলিল ধরা যায় না?

এই দীর্ঘ বর্ণনার সনদ নিয়ে হাদীস-বিশারদদের আপত্তি আছে। শায়খ আলবানী, মুহাম্মদ ফুয়াদ আব্দুল বাকী, শুআইব আরনাউত ও যুবায়ের আলী যাঈ, সবাই একে দুর্বল (যঈফ) বলেছেন। তবে আমরা শুধু এই কারণে হাদীসটি সরিয়ে রাখছি না। বরং দেখাচ্ছি, যাঁরা এটি দলিল হিসেবে আনেন, তাঁদের জন্য হাদীসটির ভেতরেই উত্তর আছে: এর বক্তা “শেষ নবী” বলার পর নিজেই ঈসা ইবনে মারইয়ামের আগমনের কথা বলেছেন।

ঈসা (আ.) তো আগের নবী, তাই “শেষ নবী” কথার সঙ্গে বিরোধ নেই?

এই উত্তর মানলে স্বীকার করতে হয়, “শেষ নবী” কথাটি মহানবী (সা.)-এর পরে আল্লাহর পক্ষ থেকে নবীর মর্যাদা নিয়ে কারো আগমনকে বাধা দেয় না। তাহলে প্রশ্ন দাঁড়ায় শুধু: কে আসবেন? হযরত শাহ ওলীউল্লাহ (রহ.)-এর মাপকাঠি এখানে সিদ্ধান্ত দেয়: মহানবী (সা.)-এর পরে এমন কোনো নবী হতে পারেন না, যিনি তাঁর মাধ্যম ছাড়া স্বাধীনভাবে কল্যাণ পেয়েছেন (আল-খায়রুল কাসীর, পৃষ্ঠা ৭৮)। যিনি আসবেন, তাঁকে এই উম্মতেরই হতে হবে।

“শেষ নবী” বললে কি অর্থ সব দিক থেকে শেষ নয়?

আহমদী মুসলমানরা বলেন, তিনি শরীয়তের দিক থেকে শেষ, স্বাধীন নবুয়্যতের দিক থেকে শেষ, মর্যাদার দিক থেকে সবার উপরে। আর তাঁর পরে আল্লাহর যে দান আসবে, তা আসবে তাঁরই মাধ্যমে। এর চেয়ে পূর্ণাঙ্গ অর্থে “শেষ” হওয়া আর কী হতে পারে?

এক কথায়, এই হাদীস যাঁরা দলিল হিসেবে আনেন, হাদীসটি নিজেই তাঁদের প্রশ্নের উত্তর দিয়ে দেয়। “শেষ নবী” আর “আগমনকারী মসীহ” একই নিঃশ্বাসে বলা হয়েছে। দুটিকে একসঙ্গে সত্য মানার একটিই পথ: শেষ মানে শরীয়ত ও স্বাধীন নবুয়্যতের শেষ, আর আগমনকারী আসবেন এই উম্মতেরই একজন হয়ে।

সংক্ষেপে

  1. ইবনে মাজাহর (৪০৭৭) যে হাদীসে “আমি শেষ নবী, তোমরা শেষ উম্মত” আছে, সেই হাদীসেই ঈসা ইবনে মারইয়ামের আগমনের বর্ণনা আছে।
  2. কয়েকজন প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস এই বর্ণনার সনদকে দুর্বল বলেছেন।
  3. “আমি শেষ নবী, আমার মসজিদ শেষ মসজিদ” হাদীস দেখায়, “শেষ” মানে পূর্ণতা ও অনুসরণের কেন্দ্র।
  4. শেষ উম্মত মানে নতুন কোনো উম্মত নয়; উম্মতী নবী এই উম্মতেরই সদস্য।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.