মির্যা সাহেব নিজেও কি “তাওয়াফ্‌ফা”র অন্য অর্থ করেছিলেন?

একটি আপত্তি প্রায়ই শোনা যায়: বারাহীনে আহমদীয়ায় তিনি নিজেই এই শব্দের অর্থ করেছিলেন “পূর্ণ করা”। কথাটির পেছনের পুরো গল্পটি শুনলে ছবিটা বদলে যায়।

৫ মিনিটে পড়ুন5 min read · in Bangla

ঈসা (আ.)-এর মৃত্যু নিয়ে আলোচনা যখন জমে ওঠে, তখন একটি আপত্তি প্রায়ই সামনে আনা হয়। বিরোধীরা বলেন, “হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নিজেই তো তাঁর প্রথম দিকের বই বারাহীনে আহমদীয়ায় তাওয়াফ্‌ফা শব্দের অর্থ করেছিলেন ‘পূর্ণ করা’। পরে তিনি বললেন এর অর্থ মৃত্যু। তাহলে তিনি কথা বদলালেন কেন?”

আপত্তিটি ন্যায্যভাবে শোনার মতো। এর উত্তরও তিনি নিজেই দিয়ে গেছেন, খোলাখুলি, কোনো লুকোচুরি ছাড়া।

তিনি নিজে কী বলেছেন

“আইয়্যামুস সুলাহ” গ্রন্থে হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই প্রশ্নের জবাব দিয়েছেন। তাঁর কথার সারকথা এরকম:

তিনি স্বীকার করেছেন, বারাহীনে আহমদীয়ার এক জায়গায় তিনি ভুলবশত তাওয়াফ্‌ফা-র অর্থ “পূর্ণ করা” লিখেছিলেন, আর কিছু মৌলভী সাহেব এ নিয়ে আপত্তি করেন। তিনি লিখেছেন, “আমি মানছি যে, সেটি আমার ভুল ছিল, কিন্তু সেটি ইলহামী ভুল ছিল না।” মানুষ হিসেবে ভুলে যাওয়া ও ভুল করা অন্য সবার মতো তাঁর মধ্যেও আছে। “খোদার ইলহাম ভুল হতে পবিত্র। কিন্তু মানুষের কথায় ভুল হবেই।” (আইয়্যামুস সুলাহ, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৪, পৃষ্ঠা ২৭১)

এই স্বীকারোক্তিতে দুটি জিনিস আলাদা করা হয়েছে। একটি হলো আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা ইলহাম। আরেকটি হলো একজন মানুষের নিজের ব্যাখ্যা বা চিন্তা, যাকে বলে ইজতিহাদ। ইলহামে ভুল থাকে না। কিন্তু ইজতিহাদে ভুল হতে পারে, এমনকি একজন নবীরও।

✦

সেই সময় তিনি কী বিশ্বাস করতেন?

বারাহীনে আহমদীয়া লেখার সময় তিনি সাধারণ মুসলমানদের প্রচলিত বিশ্বাসই মেনে চলছিলেন যে, ঈসা (আ.) আকাশ থেকে আবার নেমে আসবেন। তখনো এ বিষয়ে আল্লাহর পক্ষ থেকে স্পষ্ট নির্দেশ আসেনি। তাই আয়াতের অর্থও তিনি সেই প্রচলিত ধারণার আলোকেই লিখেছিলেন।

পরে তিনি “হাকীকাতুল ওহী” গ্রন্থে লিখেছেন, বারাহীনে আহমদীয়াতেই আল্লাহ তাঁকে “ঈসা” নামে ডেকেছিলেন। কিন্তু মুসলমানদের একটি বড় অংশ যেহেতু বিশ্বাস করত ঈসা (আ.) আকাশ থেকে নামবেন, আর তিনি নিজেও তা-ই বিশ্বাস করতেন, তাই তিনি ইলহামের বাহ্যিক অর্থ নিয়ে পুরোনো মতেই রয়ে গিয়েছিলেন। পরে বৃষ্টির মতো একের পর এক ওহী এল যে, প্রতিশ্রুত মসীহ তিনিই। তখন তিনি প্রকাশ্যে সেই সত্য ঘোষণা করলেন।

“ইজাযে আহমদী” গ্রন্থে তিনি আরও লিখেছেন, প্রায় বারো বছর তিনি বুঝতেই পারেননি যে বারাহীনে আহমদীয়ার ইলহামগুলো তাঁকেই প্রতিশ্রুত মসীহ ঘোষণা করছে। তিনি ঈসা (আ.)-এর দ্বিতীয় আগমন সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাসেই রয়ে গিয়েছিলেন। তাঁর ভাষায়, এটি ছিল আল্লাহর প্রজ্ঞা আর তাঁর সত্যবাদিতার প্রমাণ। এটা যদি কোনো মানুষের পরিকল্পনা হতো, তাহলে বারাহীনে আহমদীয়ার সময় থেকেই তিনি মসীহ হওয়ার দাবি করে বসতেন।

এটি আপত্তি, না সততার প্রমাণ?

একটু ভাবুন। একজন মানুষ যদি নিজের সুবিধার জন্য ধর্মের নাম ভাঙাতে চান, তিনি কি নিজের পুরোনো বইয়ের বিরুদ্ধে যাওয়া কোনো লেখা প্রকাশ্যে “আমার ভুল” বলে মেনে নেবেন? বরং তিনি পুরোনো কথাকে ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে নতুন কথার সঙ্গে মেলানোর চেষ্টা করতেন।

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তা করেননি। তিনি সোজাসুজি বলেছেন, “আমি তখন যা জানতাম তা-ই লিখেছিলাম; যখন আল্লাহ স্পষ্ট জ্ঞান দিলেন, তখন সত্যটা ঘোষণা করলাম।”

মহানবী (সা.)-এর জীবনেও এর একটি সুন্দর দৃষ্টান্ত আছে। যেসব বিষয়ে তখনো আল্লাহর কোনো নির্দেশ আসেনি, সেসব বিষয়ে তিনি আহলে কিতাবের প্রচলিত রীতি মেনে চলতে পছন্দ করতেন:

وَكَانَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يُحِبُّ مُوَافَقَةَ أَهْلِ الْكِتَابِ فِيمَا لَمْ يُؤْمَرْ فِيهِ بِشَىْءٍ
“আর যে বিষয়ে কোনো নির্দেশ আসেনি, সে বিষয়ে আল্লাহর রসূল (সা.) আহলে কিতাবের সঙ্গে মিল রাখা পছন্দ করতেন।” পরে তিনি সেই রীতি বদলে দেন।
সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস ৩৫৫৮

নির্দেশ আসার আগে প্রচলিত পথে চলা আর নির্দেশ আসার পর তা বদলে ফেলা কোনো দোষ নয়। এটিই আল্লাহর প্রেরিতদের পথ।

আসল প্রশ্নটি কিন্তু অন্যখানে

শেষে একটি কথা মনে রাখা দরকার। তাওয়াফ্‌ফা শব্দের অর্থ কী, তা কোনো একজন মানুষের এক সময়ের লেখার ওপর নির্ভর করে না। এর ফয়সালা করে কুরআন, মহানবী (সা.)-এর হাদীস আর আরবি ভাষা।

কুরআনে এই শব্দ যেখানেই আল্লাহর কাজ হিসেবে কোনো মানুষের জন্য এসেছে, সেখানে অর্থ মৃত্যু। মহানবী (সা.) কিয়ামতের দিন নিজের জন্য ঠিক ঈসা (আ.)-এর শব্দ “ফালাম্মা তাওয়াফ্‌ফাইতানী” ব্যবহার করবেন (সহীহ বুখারী, হাদীস ৪৬২৫)। আর হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর অর্থ করেছেন “আমি তোমাকে মৃত্যু দেব।” এই প্রমাণগুলো কারও পুরোনো বা নতুন মতের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। তাই আপত্তিটি মূল বিষয়কে একটুও দুর্বল করে না।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

আল্লাহর প্রেরিত কেউ কি ভুল করতে পারেন?

কেউ কেউ বলেন, যিনি ভুল স্বীকার করেন, তিনি আল্লাহর প্রেরিত হতে পারেন না। চলুন দেখি মহানবী (সা.) নিজের সম্পর্কে কী বলেছেন। একবার নামাযে রাকাত কম-বেশি হয়ে গেলে তিনি সাহু সিজদা দিয়ে বললেন:

إِنَّمَا أَنَا بَشَرٌ مِثْلُكُمْ، أَنْسَى كَمَا تَنْسَوْنَ
“আমি তো তোমাদের মতোই একজন মানুষ; তোমরা যেমন ভুলে যাও, আমিও তেমনি ভুলে যাই।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুস সালাত, হাদীস ৪০১

তাহলে মানবীয় ভুল নবুওয়তের বিপরীত নয়। বিপরীত হতো, যদি আল্লাহর ওহীতে ভুল থাকত, বা কেউ ভুল ধরা পড়ার পরও তার ওপর জেদ করে থাকতেন। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ঠিক উল্টোটা করেছেন: জ্ঞান আসার সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ্যে সংশোধন করেছেন।

তাহলে কি বারাহীনে আহমদীয়ার সবকিছুই সন্দেহজনক হয়ে গেল?

না। তিনি নিজেই পার্থক্যটি দেখিয়ে দিয়েছেন। বারাহীনে আহমদীয়ায় দুই রকম জিনিস ছিল: আল্লাহর ইলহাম আর তাঁর নিজের ব্যাখ্যা। ইলহামগুলো, যেমন তাঁকে “ঈসা” নামে ডাকা, পরে সত্য প্রমাণিত হয়েছে। বদলেছে কেবল তাঁর নিজের ব্যাখ্যা, যা তিনি প্রচলিত বিশ্বাসের প্রভাবে লিখেছিলেন। অর্থাৎ যেটি ভুল প্রমাণিত হলো, সেটি মানুষের অংশ; আর যেটি আল্লাহর অংশ, সেটি অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হয়েছে। এটি আপত্তির জবাবই শুধু নয়, তাঁর সত্যতার একটি নিদর্শনও।

সংক্ষেপে

  1. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেই স্বীকার করেছেন, বারাহীনে আহমদীয়ায় “পূর্ণ করা” অর্থটি তাঁর মানবীয় ভুল ছিল, ইলহামী নয়।
  2. তখন তিনি ঈসা (আ.)-এর আগমন বিষয়ে প্রচলিত বিশ্বাসেই ছিলেন; আল্লাহর স্পষ্ট ওহী আসার পর সত্য ঘোষণা করেন।
  3. নির্দেশ আসার আগে প্রচলিত পথে চলা মহানবী (সা.)-এর সুন্নতেও দেখা যায়।
  4. “তাওয়াফ্‌ফা”র অর্থ মৃত্যু, এর প্রমাণ কুরআন, হাদীস ও আরবি ভাষা; কারও এক সময়ের ভুলে তা বদলায় না।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.