মক্কার একটি বিষণ্ণ দিন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ছোট্ট ছেলে কাসেম মারা গেছেন। বাবার বুক তখনো শোকে ভারী। ঠিক তখনই মক্কার এক নেতা, আস ইবনে ওয়ায়েল, ঠাট্টা করে বলে বসল, “এ তো আবতার!” অর্থাৎ নির্বংশ, যার কোনো উত্তরসূরি থাকবে না।
আরবদের কাছে এটি ছিল বড় অপমান। তারা ভাবত, ছেলে না থাকলে মানুষের নাম আর কাজ তার মৃত্যুর সঙ্গেই মুছে যায়। শত্রুরা আশায় বুক বাঁধল, এই মানুষটি চলে গেলে তাঁর দাওয়াতও শেষ হয়ে যাবে।
প্রথম জবাব: সূরা কাওসার
আল্লাহ তাঁর রসূলকে একা ছেড়ে দেননি। সূরা কাওসার নাযিল হলো। আলইসলাম ডট অর্গে উদ্ধৃত তফসীরে জালালাইনের বর্ণনা অনুযায়ী এই সূরা আস ইবনে ওয়ায়েলের ওই খোঁটার প্রেক্ষিতেই এসেছিল।
অর্থাৎ নির্বংশ হবে শত্রুরাই, মুহাম্মদ (সা.) নন। তাঁকে দেওয়া হয়েছে “কাওসার”, অফুরন্ত কল্যাণের ধারা।
মদীনায় আরেকটি খোঁটা
বছর গড়াল। মহানবী (সা.) মদীনায় হিজরত করলেন। তাঁর পালকপুত্র ছিলেন হযরত যায়েদ বিন হারেসা (রা.)। লোকে তাঁকে “মুহাম্মদের ছেলে যায়েদ” বলেই ডাকত।
তারপর কুরআন জানিয়ে দিল, পালকপুত্র আসল পুত্র নয়। তাদেরকে তাদের নিজের বাবার নামেই ডাকতে হবে।
শত্রুদের হাতে যেন নতুন অস্ত্র উঠল। তারা বলতে লাগল, নিজের ছেলেরা তো আগেই মারা গেছে, এখন পালকপুত্রের সম্পর্কও শেষ। এবার সত্যিই এই মানুষটির কোনো উত্তরসূরি রইল না।
ঠিক এই পটভূমিতে, হিজরতের পঞ্চম বছরে, নাযিল হলো সেই বিখ্যাত আয়াত:
“কিন্তু” শব্দটির ভেতরের কথা
আয়াতটি মন দিয়ে পড়ুন। প্রথম অংশে আল্লাহ শত্রুদের একটি কথা মেনে নিচ্ছেন: হ্যাঁ, মুহাম্মদ (সা.) তোমাদের কোনো পুরুষের দৈহিক পিতা নন।
তারপর আসে আরবি শব্দ লাকিন, অর্থাৎ “কিন্তু”। এই শব্দ বলে দেয়, এখন খোঁটার জবাব আসছে। জবাবটি হলো: তিনি আল্লাহর রসূল, আর তিনি “খাতামান নাবিয়্যীন”, নবীগণের মোহর।
এবার ভাবুন। শত্রুরা বলছিল, তাঁর কোনো উত্তরসূরি নেই। জবাবে যদি শুধু বলা হয়, “তিনি শেষ নবী, তাঁর পরে আর কোনো নবী নেই”, তাহলে তো খোঁটাটা আরও পোক্ত হয়। শত্রুরা বলতে পারত, দৈহিক সন্তানও নেই, আধ্যাত্মিক উত্তরসূরিও নেই।
আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত আহমদীয়া ব্যাখ্যা ঠিক এই কথাই বলে। প্রসঙ্গ অনুযায়ী “নবীগণের মোহর” মানে, মুহাম্মদ (সা.)-এর আধ্যাত্মিক সন্তানরা হবেন অতি উঁচু মর্যাদার। একজন নবীর অনুসারীদের তাঁর আধ্যাত্মিক সন্তান বলা হয়। তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ করে তাঁদের কেউ কেউ এত উঁচুতে উঠবেন যে নবুয়্যতের মর্যাদাও পাবেন, তবে তাঁর মোহরের সত্যায়ন নিয়ে।
অর্থাৎ দৈহিক বংশধারা না থাকলেও, তিনি এক অফুরন্ত আধ্যাত্মিক বংশধারার পিতা। এই জবাব সূরা কাওসারের প্রতিশ্রুতির সঙ্গেও পুরোপুরি মিলে যায়।
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) ও খলীফাদের ব্যাখ্যা
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ, মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, মহানবী (সা.) নবীগণের মোহর এই কারণে নন যে তাঁর পরে কেউ আধ্যাত্মিক কল্যাণ পাবে না। বরং এই কারণে যে তাঁর মোহরের সত্যায়ন ছাড়া কেউ কোনো কল্যাণ পেতে পারবে না, আর তাঁর উম্মতের জন্য আল্লাহর সঙ্গে বাক্যালাপের দরজা কখনো বন্ধ হবে না (হাকীকাতুল ওহী, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২২, পৃষ্ঠা ২৯–৩০)।
হযরত মির্যা বশীরুদ্দীন মাহমুদ আহমদ, খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) তফসীরে সগীরে এই আয়াতের টীকায় লিখেছেন: এর অর্থ, তাঁর সত্যায়ন আর তাঁর শিক্ষার সাক্ষ্য ছাড়া কেউ নবুয়্যত বা বেলায়েতের মর্যাদা পেতে পারে না (তফসীরে সগীর, পৃষ্ঠা ৫৫১)।
তাই এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর প্রশংসার আয়াত। এটি তাঁর অপমানের জবাব, তাঁর মর্যাদার ঘোষণা। নির্বংশ বলে যারা খোঁটা দিয়েছিল, ইতিহাসে তাদের নাম মুছে গেছে। আর মুহাম্মদ (সা.)-এর আধ্যাত্মিক সন্তানরা আজও পৃথিবীর কোণে কোণে তাঁর নাম উঁচু করে চলেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
এই আয়াত তো শুধু যায়েদ (রা.)-এর বিষয়ে, আধ্যাত্মিক পিতৃত্বের কথা এল কোথা থেকে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আয়াতের উদ্দেশ্য শুধু এটুকু জানানো যে যায়েদ (রা.) মহানবী (সা.)-এর ছেলে নন। চলুন দেখি, একই সূরা নিজে কী বলে। এই আয়াতের কিছু আগেই আল্লাহ জানিয়েছেন:
নবী (সা.)-এর পত্নীরা যদি সব মু’মিনের মা হন, তাহলে আধ্যাত্মিক অর্থে নবী (সা.) কী? উত্তর নিজেই স্পষ্ট। তাই “কারো পিতা নন” বলার পর “কিন্তু” দিয়ে যে জবাব আসে, তা এই আধ্যাত্মিক পিতৃত্বেরই ঘোষণা। দৈহিক পিতৃত্ব অস্বীকার করা হয়েছে, আধ্যাত্মিক পিতৃত্ব নয়।
অনেক তফসীরে তো লেখা, খাতামান নাবিয়্যীন মানে শেষ নবী?
আহমদীরাও মানেন, মহানবী (সা.) শরীয়তবাহী নবীদের মধ্যে শেষ। প্রশ্ন হলো, এর অর্থ কি সব ধরনের নবুয়্যতের পুরোপুরি সমাপ্তি? উম্মতের শ্রেষ্ঠ মানুষদের কয়েকজন তা মনে করেননি।
উম্মুল মু’মিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেছেন: “তোমরা বলো, তিনি খাতামান নাবিয়্যীন; কিন্তু এ কথা বলো না যে তাঁর পরে কোনো নবী নেই” (আদ-দুররুল মানসূর, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৬১৮)। আর বিখ্যাত হানাফী আলেম মোল্লা আলী কারী (রহ.) লিখেছেন, খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ শুধু এই যে, তাঁর পরে এমন কোনো নবী আসবেন না যিনি নতুন শরীয়ত আনবেন এবং তাঁর উম্মতের অনুসারী হবেন না (আল-আসরারুল মারফূআ, পৃষ্ঠা ১৯২)। আহমদীয়া জামাতের বিশ্বাস ঠিক এটাই।
তাহলে কি যে কেউ নবী দাবি করতে পারে?
একদমই না। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) স্পষ্ট লিখেছেন: শরীয়তবাহী কোনো নবী তাঁর পরে আসতে পারেন না; শরীয়তবিহীন নবী আসতে পারেন, কিন্তু তাঁকে প্রথমে মহানবী (সা.)-এর উম্মতী হতে হবে; এই অর্থে তিনি নিজে উম্মতীও, নবীও (তাজাল্লিয়াতে ইলাহিয়্যা, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ২০, পৃষ্ঠা ৪১১–৪১২)। অর্থাৎ দরজা খোলা শুধু মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্যের পথে, তাঁর মোহরের অনুমোদন নিয়ে। এই দরজা তাঁর মর্যাদা কমায় না, বরং তাঁর আধ্যাত্মিক বংশধারার জীবন্ত প্রমাণ।
সংক্ষেপে
- ছেলে কাসেমের মৃত্যুর পর শত্রুরা মহানবী (সা.)-কে “আবতার” বা নির্বংশ বলে খোঁটা দিত; সূরা কাওসার তার জবাব।
- পালকপুত্র যায়েদ (রা.)-এর বিষয়টি স্পষ্ট হওয়ার পর খোঁটা আরও বাড়ে; তখন সূরা আহযাবের ৪১ নম্বর আয়াত নাযিল হয়।
- “লাকিন” (কিন্তু) শব্দ দেখায়, “খাতামান নাবিয়্যীন” ওই খোঁটার জবাব, তাই এটি প্রশংসা ও মর্যাদার উপাধি।
- প্রসঙ্গ অনুযায়ী অর্থ: দৈহিক পুত্র না থাকলেও তিনি এক মহান আধ্যাত্মিক বংশধারার পিতা, যাঁর মোহর ছাড়া কেউ আল্লাহর কল্যাণ পায় না।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Ahmadis believe in Khatam-e-Nabuwwat · alislam.org
- Structure and Application of the word Khatam · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.