একদিন মহানবী (সা.) ঘুম থেকে জেগে উঠলেন। মুখমণ্ডল লাল, চোখে উদ্বেগ। তিনি বারবার বলছিলেন, “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ!” তারপর বললেন, আরবদের জন্য দুর্ভোগ, এক অনিষ্ট কাছে এসে গেছে; আজ ইয়া’জুজ-মা’জুজের প্রাচীরে এতটুকু ফাঁক হয়ে গেছে। এ কথা বলে তিনি বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে একটি বৃত্ত বানিয়ে দেখালেন।
উম্মুল মু’মিনীন হযরত যয়নব বিনতে জাহশ (রা.) জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রসূল! আমাদের মাঝে পুণ্যবান লোক থাকতেও কি আমরা ধ্বংস হব? তিনি বললেন, “হ্যাঁ, যখন পাপাচার বেড়ে যাবে” (জামে তিরমিযী, আবওয়াবুল ফিতান, হাদীস ২১৮৭; একই ঘটনা সহীহ বুখারী, কিতাবু আহাদীসিল আম্বিয়া, হাদীস ৩৩৪৬)।
কারা এই ইয়া’জুজ-মা’জুজ, যাদের কথা ভেবে মহানবী (সা.) এত উদ্বিগ্ন হয়েছিলেন?
কুরআনের ছবি: প্রতিটি উচ্চতা থেকে ছুটে আসা
কুরআন শেষ যুগে তাদের আত্মপ্রকাশের কথা বলেছে এভাবে:
হাদাব মানে উঁচু ভূমি, আর নাসাল মানে দ্রুত ছুটে আগে চলে যাওয়া। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, অর্থাৎ শেষ যুগে এমন জাতি উঠবে যারা যা কিছু বড় ও মর্যাদাপূর্ণ, তাতে অন্য সব জাতিকে পেছনে ফেলবে; জ্ঞান-বিজ্ঞান, শিল্প, রাষ্ট্রনীতি, বাণিজ্য, সবখানে তারা এগিয়ে থাকবে। দুনিয়ার সব উচ্চতায় তারা পৌঁছাবে, কিন্তু আধ্যাত্মিক উচ্চতা থেকে বঞ্চিত থাকবে (শাহাদাতুল কুরআন, রূহানী খাযায়েন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৩৬১-৩৬২)।
নামের ভেতরেই পরিচয়: আগুন
নাম দুটির মূল আরবি শব্দ আজীজ, যার অর্থ আগুনের লেলিহান শিখা। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, আল্লাহ্ তাঁকে জানিয়েছেন, ইয়া’জুজ-মা’জুজ সেই জাতি যারা আগুনের ব্যবহারে অন্য সবার চেয়ে দক্ষ। তাদের জাহাজ, রেলগাড়ি আর কলকারখানা চলবে আগুনে, তাদের যুদ্ধও হবে আগুনে। এরা পশ্চিমের জাতিগুলো। ইহুদিদের ধর্মগ্রন্থেও ইউরোপের জাতিগুলোকেই গগ ও মাগগ বলা হয়েছে (আইয়ামুস সুলহ, রূহানী খাযায়েন, ১৪শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪২৪-৪২৫)।
বাইবেলের হিযকিল (যিহিষ্কেল) পুস্তকের ৩৮ অধ্যায়ে “মাগোগ দেশের গোগ”-এর কথা আছে, যাকে মেশক আর তুবলের অধিপতি বলা হয়েছে; আর বলা হয়েছে সে উত্তরের দূর প্রান্ত থেকে ঝড়ের মতো, মেঘের মতো দেশ ঢেকে আসবে।
হাদীসের দৃশ্য: যাদের সাথে কেউ পারবে না
হযরত নাওয়াস ইবনে সাম‘আন (রা.)-এর দীর্ঘ হাদীসে মহানবী (সা.) বলেছেন, দাজ্জালের পর আল্লাহ্ ঈসা (আ.)-কে ওহী করে জানাবেন:
এই হাদীসের কয়েকটি কথা লক্ষ্য করুন। প্রথম কথা: তাদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই, এমনকি মসীহেরও না। তাই মসীহ্ তলোয়ার তুলবেন না; তিনি নিজের লোকদের নিয়ে আশ্রয় নেবেন। একই হাদীসে আছে, এরপর ঈসা (আ.) ও তাঁর সঙ্গীরা আল্লাহর কাছে কাতর হয়ে দোয়া করবেন, আর আল্লাহ্ তাদের ঘাড়ে এক ধরনের কীট পাঠাবেন। অর্থাৎ ইয়া’জুজ-মা’জুজের পতন আসবে দোয়া আর আল্লাহর ফয়সালায়, মানুষের অস্ত্রে নয়।
দ্বিতীয় কথা: তাদের প্রথম দল তবারিয়া হ্রদ পার হওয়ার সময় সব পানি পান করে ফেলবে, আর শেষ দল এসে বলবে, এখানে একসময় পানি ছিল। পৃথিবীর সম্পদ নিঃশেষ করে ফেলার এ এক জীবন্ত ছবি।
এবার আমাদের চারপাশে তাকান। গত দুই শতাব্দীতে কোন জাতিগুলো আগুন দিয়ে চলা ইঞ্জিন, জাহাজ, বিমান আর অস্ত্রে পৃথিবীর প্রতিটি উচ্চতা দখল করেছে? কাদের সামরিক শক্তির সামনে অন্যরা অসহায়? হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) লিখেছেন, কুরআনে আর হাদীসে বলা ইয়া’জুজ-মা’জুজের প্রতিটি চিহ্ন ইউরোপের শক্তিগুলোর উপরই মেলে; যুদ্ধ আর রাষ্ট্রনীতিতে তাদের সমকক্ষ কেউ নেই (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৩-৮৮)।
শিঙায় ফুঁ: মসীহ্ মওউদের ডাক
সূরা কাহফে যুলকারনাইন আর ইয়া’জুজ-মা’জুজের কাহিনীর শেষে আল্লাহ্ বলেন:
জাতিগুলো ঢেউয়ের মতো একে অপরের উপর আছড়ে পড়বে। দুটি বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাস যেন এই আয়াতেরই ছবি। তারপর শিঙায় ফুঁ দেওয়া হবে। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) ব্যাখ্যা করেছেন, নবীরা আল্লাহর শিঙা, যাদের হৃদয়ে তিনি নিজের আওয়াজ ফুঁকে দেন। ইয়া’জুজ-মা’জুজের যুগে আল্লাহ্ মসীহ্ মওউদের মাধ্যমে পৃথিবীকে ডাক দেবেন, আর সেই ডাক শুনে সৎ মানুষেরা এক ধর্মের পতাকাতলে একত্রিত হবেন (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড)।
লেকচার লাহোর-এর এক টীকায় তিনি আরও লিখেছেন, যুলকারনাইনের কাহিনী আসলে মসীহ্ মওউদ সম্পর্কে ভবিষ্যদ্বাণী: যারা ইয়া’জুজ-মা’জুজের হাতে কষ্ট পাবে আর তাঁর কাছে সাহায্য চাইবে, তিনি তাদের জন্য ইসলামের পক্ষে মজবুত যুক্তির এক উজ্জ্বল প্রাচীর গড়ে দেবেন, যা ইয়া’জুজ-মা’জুজের আক্রমণ ঠেকাবে।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
ইয়া’জুজ-মা’জুজ তো দেয়ালের পেছনে আটকে থাকা এক বিশেষ সৃষ্টি, তারা মানুষ কি না তাও তো স্পষ্ট নয়?
কুরআনে যুলকারনাইনের কাহিনীতে স্পষ্ট, তারা দেশে ফাসাদ সৃষ্টিকারী মানুষ, যাদের ঠেকাতে স্থানীয় লোকেরা কর দিয়ে প্রতিবন্ধক বানাতে চেয়েছিল (সূরা আল-কাহফ ১৮:৯৫)। দেয়াল চেটে চেটে পাতলা করার যে গল্প প্রচলিত, তা কুরআনে নেই, বুখারী বা মুসলিমেও নেই। তিরমিযীর বর্ণনায় মহানবী (সা.) প্রাচীরে “এতটুকু ফাঁক”-এর কথা বলেছিলেন ঘুম থেকে জেগে উঠে। আঙুলের বৃত্তের মতো ছোট্ট সেই ফাঁক জানাচ্ছিল, তাদের উত্থানের সূচনা হয়ে গেছে; কোনো দৈত্যের জিভে দেয়াল ক্ষয়ের গল্প নয়।
দাজ্জাল আর ইয়া’জুজ-মা’জুজ কি আলাদা দুটি শক্তি নয়?
হাদীসগুলোতে দুটোরই প্রায় সারা পৃথিবীর উপর আধিপত্যের কথা আছে, আর একই সময়ে, মসীহের যুগে। একই সময়ে পৃথিবীতে দুটি আলাদা সর্বগ্রাসী শক্তি থাকতে পারে না। হযরত মসীহ্ মওউদ (আ.) তাই বলেছেন, একই পশ্চিমা খ্রিষ্টান জাতির দুই দিক: ধর্মীয় প্রতারণার দিকটি দাজ্জাল, আর রাজনৈতিক ও সামরিক আধিপত্যের দিকটি ইয়া’জুজ-মা’জুজ (চশমায়ে মা‘রিফত, রূহানী খাযায়েন, ২৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৮৫-৮৭, পাদটীকা)।
মসীহ্ তাহলে তাদের হারাবেন কীভাবে?
হাদীস নিজেই বলেছে, তাদের সাথে যুদ্ধ করার শক্তি কারও নেই। তাই উত্তর তলোয়ার নয়। মসীহের অস্ত্র দোয়া, যুক্তি আর আল্লাহর নিদর্শন। হাদীসে মসীহ্ ও তাঁর সঙ্গীরা দোয়া করেন, আর আল্লাহ্ নিজেই ফয়সালা পাঠান। আজ আহমদীয়া মুসলিম জামাত ঠিক এই পথেই চলছে: অস্ত্র নয়, দলিল আর দোয়া দিয়ে পৃথিবীর প্রতিটি দেশে ইসলামের দাওয়াত।
সংক্ষেপে
- কুরআন বলে, শেষ যুগে ইয়া’জুজ-মা’জুজ প্রতিটি উচ্চতা থেকে ছুটে আসবে, অর্থাৎ দুনিয়ার সব ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।
- নামের মূল “আজীজ” মানে আগুন; আগুনে চলা যন্ত্র আর অস্ত্রে যারা পৃথিবী জয় করেছে, তারা পশ্চিমের শক্তিগুলো।
- সহীহ মুসলিমের হাদীসে তাদের সাথে কারও যুদ্ধের শক্তি নেই; মসীহ্ তাদের মোকাবিলা করবেন দোয়ায়।
- শিঙায় ফুঁ মানে মসীহ্ মওউদের ডাক, যা মানুষকে এক পতাকাতলে একত্রিত করবে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.