হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) আসলে কী দাবি করেছিলেন?

মুজাদ্দিদ, মসীহ, মাহদী, উম্মতী নবী: দাবিগুলো এসেছে ধাপে ধাপে। কেন এভাবে এল, আর প্রতিটি দাবির আসল অর্থ কী, তাঁর নিজের কথায় একটি সরল পরিচয়।

৮ মিনিটে পড়ুন8 min read · in Bangla

উনিশ শতকের শেষভাগ। পাঞ্জাবের ছোট্ট গ্রাম কাদিয়ান। রেলস্টেশন থেকে অনেক দূরে, কাঁচা রাস্তার শেষে একটি মসজিদ। সেখানে একজন মানুষ দিনের পর দিন কুরআন পড়েন, দোয়া করেন, আর ইসলামের পক্ষে বই লেখেন।

বাইরে তখন ইসলামের দুঃসময়। খ্রিষ্টান মিশনারিরা প্রকাশ্যে ঘোষণা দিচ্ছে, ইসলাম শীঘ্রই মুছে যাবে। আর্য সমাজের পণ্ডিতরা মহানবী (সা.)-এর বিরুদ্ধে বই লিখছেন। মুসলমানরা বিভক্ত, ক্লান্ত।

এই মানুষটি হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)। ধীরে ধীরে তিনি ঘোষণা করলেন, আল্লাহ তাঁকে এই যুগের জন্য একটি বিশেষ দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই দায়িত্বের পরিচয় এসেছে কয়েকটি ধাপে।

ধাপে ধাপে দাবি

১৮৮২: আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদিষ্ট ও মুজাদ্দিদ। alislam.org অনুযায়ী, ১৮৮২ সালে তাঁর ওপর সেই ইলহাম হয়, যাতে প্রকাশ পায় যে আল্লাহ তাঁকে নিজের কাজের জন্য নিযুক্ত করেছেন। তিনি লিখেছেন, তেরো শতাব্দী যখন শেষ হয়ে আসছিল, তখন আল্লাহ তাঁকে ইলহামের মাধ্যমে জানালেন যে তিনিই চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ (কিতাবুল বারিয়্যাহ)। মুজাদ্দিদ মানে ধর্মের সংস্কারক, যাঁর আগমনের প্রতিশ্রুতি মহানবী (সা.) প্রতিটি শতাব্দীর শুরুর জন্য দিয়ে গেছেন।

১৮৮৯: বয়আত ও জামাত প্রতিষ্ঠা। আল্লাহর নির্দেশে ১৮৮৯ সালের ২৩ মার্চ লুধিয়ানায় তিনি প্রথম বয়আত নেন। এভাবেই আহমদীয়া মুসলিম জামাতের যাত্রা শুরু।

১৮৯১: প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী। ১৮৯১ সালে কাদিয়ানে তাঁর ওপর বারবার ইলহাম হয় যে হযরত ঈসা (আ.) স্বাভাবিক মৃত্যুবরণ করেছেন, আর তাঁর “দ্বিতীয় আগমন” মানে তাঁর গুণে গুণান্বিত একজনের আগমন; আর সেই ব্যক্তি তিনিই। একই সাথে তিনি ঘোষণা করেন, মহানবী (সা.) যে মাহদীর সুসংবাদ দিয়েছেন, তিনিই সেই মাহদী, আর মসীহ ও মাহদী আলাদা দুজন নন, একই ব্যক্তি।

তাঁর নিজের কথায় (তাযকিরাতুশ শাহাদাতাইন): “কয়েক বছর পর আল্লাহর ওহী আমাকে স্পষ্ট জানাল, যে মসীহের আগমনের প্রতিশ্রুতি এই উম্মতের জন্য শুরু থেকেই দেওয়া হয়েছিল, আর যে মাহদীর আগমন ইসলামের অধঃপতন ও পথভ্রষ্টতার বিস্তারের যুগে আল্লাহ নির্ধারিত করে রেখেছিলেন, যিনি সরাসরি আল্লাহর কাছ থেকে হেদায়াত পাবেন… আর যাঁর আগমনের সুসংবাদ মহানবী (সা.) তেরোশ বছর আগে দিয়েছিলেন, আমিই সেই ব্যক্তি।”

১৯০১: উম্মতী নবী। ১৯০১ সালে তিনি এক গলতী কা ইযালা (একটি ভুলের অপনোদন) নামে একটি ছোট পুস্তিকা প্রকাশ করেন। সেখানে তিনি ব্যাখ্যা করেন, তিনি কোনো নতুন শরীয়ত আনেননি, স্বাধীন নবীও নন; তিনি মহানবী (সা.)-এর পূর্ণ আনুগত্য ও কল্যাণে, তাঁরই প্রতিচ্ছায়া (যিল্লী ও বুরুযী) হিসেবে নবুয়তের মর্যাদা পেয়েছেন। alislam.org-এ বইটির ইংরেজি অনুবাদ “A Misconception Removed” নামে আছে, যেখানে তাঁর এই বাক্যটি উদ্ধৃত: “যেখানেই আমি নবী বা রসূল হওয়া অস্বীকার করেছি, তা কেবল এই অর্থে যে আমি কোনো স্বাধীন শরীয়ত আনিনি, আর আমি স্বাধীন নবীও নই।”

✦

সব দাবির মূল কথা একটি

নামগুলো আলাদা শোনালেও দাবি আসলে একটি। আহমদীয়া মুসলিম জামাতের চতুর্থ খলীফা হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.) এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে বলেছেন, মূল দাবি ছিল: আল্লাহ তাঁকে এই যুগের সংস্কারক হিসেবে পাঠিয়েছেন।

বিভিন্ন ধর্ম শেষ যুগে একজন বিশ্ব-সংস্কারকের অপেক্ষায় আছে। মুসলমানরা অপেক্ষা করছে মসীহ ও মাহদীর, খ্রিষ্টানরা ঈসার দ্বিতীয় আগমনের, হিন্দুরা কৃষ্ণের পুনরাগমনের। সবাই যদি আলাদা আলাদা ব্যক্তি হিসেবে আসতেন, তাহলে আল্লাহর নামেই ধর্মে ধর্মে নতুন সংঘাত শুরু হতো। তাই আহমদীয়া ব্যাখ্যা হলো, এই নামগুলো একজন সংস্কারকের ভিন্ন ভিন্ন উপাধি, যিনি সবাইকে এক করবেন। আর তিনি হবেন মহানবী (সা.)-এর একজন অনুসারী, কুরআন ও সুন্নাহর অনুগামী।

তাঁর ওপর একটি ইলহাম ছিল: “জারিউল্লাহি ফী হুলালিল আম্বিয়া”, অর্থাৎ “আল্লাহর রসূল, সকল নবীর পোশাকে।” এর অর্থ, অতীতের নবীদের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যের প্রতিচ্ছবি এক ব্যক্তির মধ্যে প্রকাশিত হবে (বারাহীনে আহমদীয়া, পঞ্চম খণ্ড)।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“একের পর এক নতুন দাবি করা কি মিথ্যাবাদীর লক্ষণ নয়?”

এখানে কেউ কেউ বলেন, প্রথমে মুজাদ্দিদ, পরে মসীহ, পরে নবী, এভাবে দাবি বাড়ানো সন্দেহজনক। চলুন মহানবী (সা.)-এর জীবনের দিকে তাকাই। প্রথমে আল্লাহ বললেন:

وَاَنۡذِرۡ عَشِیۡرَتَکَ الۡاَقۡرَبِیۡنَ
“এবং তুমি (সর্বপ্রথম) নিজের নিকটতম আত্মীয়স্বজনদিগকে সতর্ক কর,”
সূরা আশ-শু‘আরা ২৬:২১৫
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এগুলো ২৬:২১৪ ও ৭:১৫৮।

পরে ঘোষণা এল:

قُلۡ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ جَمِیۡعَا
“তুমি বল, হে মানবজাতি! নিশ্চয় আমি তোমাদের সকলের জন্য সেই আল্লাহ্‌র রসূল…”
সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৫৯

আল্লাহর প্রেরিতরা নিজের ইচ্ছায় দাবি বাড়ান না; আল্লাহ যখন যতটুকু প্রকাশ করেন, তখন ততটুকু ঘোষণা করেন। আর একটু ভাবুন: একজন মিথ্যাবাদী প্রথম দাবির পরই যখন কাফির ফতোয়া, গালি আর বয়কটের শিকার হয়, তখন সে কি আরও বড় দাবি করে বিপদ বাড়াবে? বিরোধিতা যত বেড়েছে, তিনি তত দৃঢ়ভাবে আল্লাহর দেওয়া পরিচয় ঘোষণা করেছেন। এটি দুনিয়াদার মানুষের আচরণ নয়।

“নবী হওয়ার দাবি কি খাতামান নাবিয়্যীনের পরিপন্থী নয়?”

তিনি নিজেই এ প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। এক গলতী কা ইযালা-র মূল কথা: খাতামান নাবিয়্যীনের আয়াতে এই ভবিষ্যদ্বাণী আছে যে মহানবী (সা.)-এর পর কেবল তাঁরই প্রতিচ্ছায়া আসতে পারে, যে কখনো মূল থেকে স্বাধীন নয়। শরীয়তবাহী নবুয়তের দরজা বন্ধ। বরং যদি হযরত ঈসা (আ.) নিজে, যিনি বনী ইসরাঈলের স্বাধীন নবী, ফিরে আসেন, তখনই খাতামান নাবিয়্যীনের অর্থ বদলে যায়। হযরত মির্যা তাহের আহমদ (রহ.)-ও বলেছেন, শেষ শরীয়ত, শেষ কিতাব আর অনুসরণযোগ্য শেষ নেতা হলেন মহানবী (সা.)।

“কৃষ্ণ বা অন্য ধর্মের নামে দাবি কেন?”

কারণ ইসলাম বিশ্বজনীন। কুরআন বলে, প্রত্যেক জাতিতে আল্লাহর সতর্ককারী এসেছেন। অন্য ধর্মের মানুষ যে প্রতিশ্রুত সংস্কারকের অপেক্ষায় আছে, সেই প্রতিশ্রুতিও যদি মহানবী (সা.)-এর এক অনুসারীর মধ্যে পূর্ণ হয়, তাহলে সব ধর্মের মানুষকে ইসলামের দিকে ডাকার একটি সেতু তৈরি হয়। এটি অন্য ধর্মের কাছে মাথা নত করা নয়, বরং তাদের প্রতীক্ষার উত্তর ইসলামের মধ্যে দেখানো।

সংক্ষেপে

  1. ১৮৮২ সালে তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রত্যাদিষ্ট ও চতুর্দশ শতাব্দীর মুজাদ্দিদ হওয়ার ঘোষণা দেন; ১৮৮৯ সালে জামাত প্রতিষ্ঠা করেন।
  2. ১৮৯১ সালে তিনি ঘোষণা করেন, ঈসা (আ.) মৃত্যুবরণ করেছেন, আর প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী একই ব্যক্তি, তিনিই।
  3. ১৯০১ সালে তিনি ব্যাখ্যা করেন, তিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসরণে উম্মতী নবী, শরীয়তবাহী বা স্বাধীন নবী নন।
  4. সব দাবির মূল একটি: তিনি এই যুগের একমাত্র প্রতিশ্রুত সংস্কারক, মহানবী (সা.)-এর সেবক।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.