১৮৯৪ সালের ২১ মার্চ। রমযান মাসের ১৩ তারিখের সন্ধ্যা। কাদিয়ানের আকাশে সূর্য ডোবার কিছুক্ষণ পর চাঁদে গ্রহণ লাগল।
পনেরো দিন পর, ৬ এপ্রিল, শুক্রবার সকাল। রমযানের ২৮ তারিখ। এবার গ্রহণ লাগল সূর্যে।
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) তখন কয়েক বছর আগে প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী হওয়ার দাবি করেছেন। চারদিকে প্রবল বিরোধিতা। আর একই রমযানে, নির্দিষ্ট দুই তারিখে, আকাশে দেখা দিল ঠিক সেই দুটি নিদর্শন, যার কথা শত শত বছর আগে লেখা হয়েছিল।
হাদীসটি কী বলে, আর আপত্তিটি কী?
হিজরী চতুর্থ শতকের বিখ্যাত মুহাদ্দিস ইমাম আলী ইবনে উমর আদ-দারাকুতনী (রহ.) তাঁর সুনান গ্রন্থে এই বর্ণনাটি লিপিবদ্ধ করেছেন। বর্ণনাকারী হযরত ইমাম মুহাম্মদ বাকের (রহ.), যিনি হযরত ইমাম যয়নুল আবেদীন (রহ.)-এর পুত্র এবং মহানবী (সা.)-এর পরিবারের (আহলে বায়ত) সদস্য।
চাঁদে গ্রহণ লাগতে পারে শুধু চান্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে; সূর্যে শুধু ২৭, ২৮ ও ২৯ তারিখে। তাই “প্রথম রাত” মানে ১৩ রমযান, আর “মাঝের দিন” মানে ২৮ রমযান। ১৮৯৪ সালে ঠিক এ দুই তারিখেই গ্রহণ হয়েছিল।
বিরোধীরা এখানে দুটি কথা বলেন। প্রথমত, এটি মহানবী (সা.)-এর বাণী নয়, ইমাম বাকের (রহ.)-এর নিজের কথা। দ্বিতীয়ত, এর বর্ণনাকারীদের মধ্যে একজনকে মিথ্যাবাদী বলা হয়েছে, তাই এটি অত্যন্ত দুর্বল।
কুরআনই এই ভবিষ্যদ্বাণীর মূল
প্রথমে দেখি, বিষয়টি কি শুধু একটি বর্ণনার ওপর দাঁড়িয়ে আছে? না। পবিত্র কুরআন শেষ যুগের লক্ষণ হিসেবে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের কথা নিজেই বলেছে:
সূর্যগ্রহণের সময় পৃথিবী থেকে দেখলে সূর্য আর চাঁদ একই দিকে থাকে; এ কারণেই “সূর্য ও চন্দ্রকে একত্রিত করা হবে” কথাটি সূর্যগ্রহণের দিকে ইঙ্গিত করে। আর এর ঠিক আগের আয়াতে প্রশ্ন ছিল, “কিয়ামতের দিন কখন হবে?” অর্থাৎ শেষ যুগের আলামত। দারাকুতনীর হাদীস এই আয়াতেরই বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেয়: কোন মাসে, কোন তারিখে, কার জন্য।
অদৃশ্যের খবর কে দিতে পারেন?
এবার মূল প্রশ্ন: এটি কি ইমাম বাকের (রহ.)-এর নিজের অনুমান হতে পারে? কয়েক শতাব্দী পরের একটি নির্দিষ্ট রমযানের নির্দিষ্ট দুই তারিখে আকাশে কী ঘটবে, আর তা কার সত্যতার সাক্ষী হবে, এ খবর কোনো মানুষ নিজের থেকে দিতে পারে না। কুরআন স্পষ্ট বলে দিয়েছে, এমন খবর আল্লাহ কাকে দেন:
হযরত মসীহ মওউদ (আ.) তোহফায়ে গোলড়বিয়া গ্রন্থে ঠিক এই যুক্তিটি দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, এই হাদীসের সত্যতার পক্ষে কুরআনের দুটি সাক্ষ্য আছে। একটি সূরা কিয়ামার আয়াত, যা একই মাসে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করছে। অন্যটি সূরা জিন্নের এই আয়াত, যা স্পষ্ট অদৃশ্যের জ্ঞানকে রসূলদের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে। তাই যে ভবিষ্যদ্বাণী এত পরিষ্কারভাবে পূর্ণ হলো, তা নিশ্চয়ই মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকেই এসেছে। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪–১৩৬)
তিনি একটি চ্যালেঞ্জও দিয়েছেন: আদম (আ.) থেকে আজ পর্যন্ত কোনো মিথ্যাবাদী বা রসূল ছাড়া অন্য কেউ এমন ভবিষ্যদ্বাণী করেছে, যাতে মাস, তারিখ আর একজন অস্বীকৃত দাবিদারের কথা একসাথে আছে, এমন একটি নজির দেখাও। এমন নজির কেউ দেখাতে পারেননি।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
বর্ণনাকারীদের একজন তো দুর্বল, তাহলে হাদীসটি কীভাবে গ্রহণযোগ্য?
এখানে কেউ কেউ বলেন, সনদে একজন বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য নন। চলুন দেখি হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এর কী উত্তর দিয়েছেন।
তিনি লিখেছেন, বর্ণনাকারী সত্যিই অগ্রহণযোগ্য হলে আপত্তিটি যায় ইমাম দারাকুতনীর ওপর, যিনি এত বড় মুহাদ্দিস যে সহীহ বুখারীরও সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করেছেন। হাজার বছরে কোনো বড় মুহাদ্দিস এই হাদীসকে “মওযূ” (জাল) বলেননি; বরং আলেমরা যুগ যুগ ধরে নিজেদের বইয়ে এটি উদ্ধৃত করে এসেছেন। তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন, কোনো বড় মুহাদ্দিসের বই থেকে এটি জাল প্রমাণ করতে পারলে একশো টাকা পুরস্কার দেবেন। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৩–১৩৪)
তিনি আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন, মুহাদ্দিসদের নিয়ম এটি নয় যে বর্ণনাকারীর সামান্য সমালোচনা হলেই হাদীস বাতিল। ইবনে খালদুনের কথা উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, মাহদী সম্পর্কিত হাদীসগুলোর একটিও সমালোচনা থেকে মুক্ত নয়; অথচ সেগুলো মেনে নেওয়া হয়। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৪) তাহলে যে হাদীসকে কুরআন সমর্থন করে আর বাস্তব ঘটনা সত্য প্রমাণ করেছে, শুধু সেটিকেই ফেলে দেওয়া কি ন্যায়বিচার?
সবচেয়ে বড় কথা: সনদ নিয়ে আলোচনা হয় তখনই, যখন জানা থাকে না কথাটি সত্য কি না। কিন্তু এই ভবিষ্যদ্বাণী তো ১৮৯৪ সালে আকাশে পূর্ণ হয়ে গেছে। যে খবর অক্ষরে অক্ষরে সত্য হয়েছে, তাকে মিথ্যা বলার আর সুযোগ থাকে না।
হাদীসে তো “রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন” কথাটি নেই?
এটি ঠিক, বর্ণনাটি ইমাম বাকের (রহ.)-এ গিয়ে থেমেছে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজেও এ কথা স্বীকার করেছেন যে, বর্ণনাটি বহুল প্রচলিত হওয়ায় একে মহানবী (সা.) পর্যন্ত পৌঁছে দেখানোর প্রয়োজন মনে করা হয়নি। কিন্তু তিনি বলেছেন, কুরআনের দুই সাক্ষ্য একে মহানবী (সা.)-এর সাথে যুক্ত করে দিয়েছে, কারণ এমন স্পষ্ট অদৃশ্যের খবর রসূল ছাড়া কেউ দিতে পারেন না। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৫–১৩৬)
লক্ষ করুন, হাদীসের ভাষাও বলছে “আমাদের মাহদী”। ইমাম বাকের (রহ.) নিজে কোনো নবী ছিলেন না; ভবিষ্যতের আকাশের খবর তাঁর কাছে এসেছে তাঁর পূর্বপুরুষ মহানবী (সা.)-এর কাছ থেকেই। উৎস তাই একটিই হতে পারে।
অন্য মাহদী-দাবিদারদের সময়েও তো রমযানে গ্রহণ হয়েছে?
হ্যাঁ, রমযানে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ ইতিহাসে বহুবার হয়েছে। কিন্তু ভবিষ্যদ্বাণীর শর্ত শুধু গ্রহণ নয়। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) চারটি দিক উল্লেখ করেছেন: চন্দ্রগ্রহণ নির্ধারিত রাতগুলোর প্রথম রাতে, সূর্যগ্রহণ নির্ধারিত দিনগুলোর মাঝের দিনে, মাসটি রমযান, আর একজন দাবিদার উপস্থিত থাকবেন যাঁকে অস্বীকার করা হচ্ছে। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩৬)
অধ্যাপক সালেহ মুহাম্মদ আলাদ্দীন ও অধ্যাপক জি. এম. বল্লভ পঁচিশজন মাহদী-দাবিদারের সময়ের গ্রহণ হিসাব করেছেন। কারো ক্ষেত্রেই নিশ্চিতভাবে দেখা যায়নি যে দাবির পর তাঁর এলাকায় ১৩ ও ২৮ রমযানে দুটি গ্রহণ দেখা গেছে। আর গ্রহণকে নিজের সত্যতার নিদর্শন বলে ঘোষণা দিয়েছেন, এমন অন্য কোনো দাবিদারের কথাও পাওয়া যায় না। এই চারটি শর্ত একসাথে পূর্ণ হয়েছে কেবল একজনের ক্ষেত্রে।
সংক্ষেপে
- সূরা কিয়ামা শেষ যুগে চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণের ভবিষ্যদ্বাণী করেছে; দারাকুতনীর হাদীস তার বিস্তারিত দিয়েছে।
- এমন স্পষ্ট অদৃশ্যের খবর কুরআনের ভাষায় রসূল ছাড়া কেউ দিতে পারেন না; তাই এর উৎস মহানবী (সা.)।
- হাজার বছরে কোনো বড় মুহাদ্দিস একে জাল বলেননি; বর্ণনাকারীর সমালোচনা দিয়ে একটি পূর্ণ হওয়া ভবিষ্যদ্বাণী বাতিল হয় না।
- ১৮৯৪ সালের ১৩ ও ২৮ রমযানে, একজন অস্বীকৃত দাবিদারের উপস্থিতিতে, আকাশ নিজেই এর সত্যতার সাক্ষ্য দিয়েছে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- The Truth About Eclipses · alislam.org
- The Advent of the Promised Messiah as Vindicated by the Signs of the Lunar and Solar Eclipses · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.