১৯০২ সাল। পাঞ্জাবে প্লেগ মহামারী ছড়িয়ে পড়ছে। এই কঠিন সময়ে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) একটি ছোট বই লিখলেন, নাম কিশতিয়ে নূহ, অর্থাৎ “নূহের তরী”। এর একটি অংশের শিরোনাম “আমাদের শিক্ষা”।
এটি অনেকটা শিক্ষকের শেষ উপদেশের মতো। তিনি অনুসারীদের বলছেন, আমার জামাতে থাকতে হলে তোমাদের কী মানতে হবে, কী করতে হবে। কেউ যদি জানতে চায় তিনি নতুন কোনো ধর্ম দিয়েছেন কি না, তার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর নেই।
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) নতুন নবুওয়ত, নতুন ধর্ম, নতুন নামায, নতুন কিবলা, এমনকি নতুন কুরআন বানিয়েছেন। অর্থাৎ আহমদীয়াত ইসলামের ভেতরের কোনো জামাত নয়, বরং আলাদা একটি ধর্ম।
এই অভিযোগের প্রতিটি অংশ মিলিয়ে দেখার মতো তথ্য তাঁর নিজের লেখাতেই আছে। চলুন একে একে দেখি।
“আমাদের শিক্ষা”: তাঁর নিজের ভাষায়
কুরআন নিয়ে। তিনি লিখেছেন, কুরআনকে পরিত্যক্ত জিনিসের মতো ছেড়ে দিও না, কারণ এতেই তোমাদের জীবন। যারা কুরআনকে সম্মান করবে, আকাশে তারা সম্মান পাবে। যারা প্রতিটি হাদীস ও প্রতিটি কথার ওপর কুরআনকে অগ্রাধিকার দেবে, আকাশে তাদের অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। আজ পৃথিবীর বুকে মানুষের জন্য কুরআন ছাড়া আর কোনো কিতাব নেই। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩)
নবী নিয়ে। একই জায়গায় তিনি লিখেছেন, আদম সন্তানের জন্য মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) ছাড়া আর কোনো রসূল ও শাফায়াতকারী নেই। তাই এই মহিমান্বিত নবীর প্রতি সত্যিকার ভালোবাসা গড়ে তোলো, আর কাউকে তাঁর ওপর প্রাধান্য দিও না।
নামায, রোযা, যাকাত, হজ নিয়ে। তিনি লিখেছেন, পাঁচ ওয়াক্ত নামায এমন ভয় আর মনোযোগের সাথে পড়ো যেন তোমরা আল্লাহকে দেখছ। রোযা আল্লাহর জন্য সততার সাথে পূর্ণ করো। যার ওপর যাকাত ফরয, সে যাকাত দিক; যার ওপর হজ ফরয আর কোনো বাধা নেই, সে হজ করুক। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫)
আকীদা নিয়ে। আর বিশ্বাসের ব্যাপারে আল্লাহ যা চান, তা হলো: আল্লাহ এক, আর মুহাম্মদ (সা.) তাঁর নবী, তিনি খাতামুল আম্বিয়া এবং সবার শ্রেষ্ঠ। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫–১৬)
একই কুরআন, একই নবী, একই পাঁচ ওয়াক্ত নামায, একই রোযা, একই হজ। নতুন ধর্মের কোনো চিহ্ন এখানে নেই।
কিবলা ও নামায: মহানবী (সা.)-এর মানদণ্ড
আহমদী মুসলমানরা মক্কার কা‘বার দিকে মুখ করে নামায পড়েন, সেই একই তাকবীর, রুকু, সিজদা আর সূরা ফাতিহা দিয়ে। কে মুসলমান, তার একটি সহজ মানদণ্ড মহানবী (সা.) নিজেই দিয়ে গেছেন:
যে কেউ কোনো আহমদী মসজিদে গিয়ে নিজের চোখে নামায দেখে আসতে পারেন। নামায, কিবলা আর কুরআন, তিনটিই সেই একই, যা মহানবী (সা.) রেখে গেছেন।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
তিনি তো নবী হওয়ার দাবি করেছেন; নবুওয়ত মানেই কি নতুন ধর্ম নয়?
এখানে কেউ কেউ বলেন, নবী এলে নতুন শরীয়ত আসে, তাই নতুন ধর্মও আসে। চলুন দেখি তিনি নিজে কী বলেছেন। এক গলতী কা ইযালা-য় তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর পর কিয়ামত পর্যন্ত এমন কোনো নবী আসতে পারেন না যাঁকে নতুন শরীয়ত দেওয়া হবে; আর মহানবী (সা.)-এর মাধ্যম ছাড়া, তাঁর প্রতি পরিপূর্ণ আত্মনিবেদন ছাড়া কেউ নবুওয়তের উপাধি পেতে পারেন না। (A Misconception Removed, ইংরেজি সংস্করণ, পৃষ্ঠা ৬–৭)
কিশতিয়ে নূহ-তে তিনি এর একটি সুন্দর উপমা দিয়েছেন: আয়নায় নিজের চেহারা দেখলে দুটি মনে হয়, কিন্তু আসলে একজনই; পার্থক্য শুধু আসল আর প্রতিচ্ছবির। খাদেম তার মনিব থেকে আলাদা নয়, ডাল তার শিকড় থেকে আলাদা নয়। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৬) যে নবুওয়ত নতুন শরীয়ত আনে না আর মহানবী (সা.)-এর অনুসরণ থেকেই জন্ম নেয়, তা নতুন ধর্ম নয়।
তাঁর ইলহামগুলো কি কুরআনের পাশে আরেকটি কিতাব নয়?
তাঁর নিজের উত্তর: আজ পৃথিবীতে মানুষের জন্য কুরআন ছাড়া আর কোনো কিতাব নেই; আর আকাশের নিচে কুরআনের সমমর্যাদার কোনো কিতাব নেই। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৩) ইলহাম বা আল্লাহর সাথে বাক্যালাপ উম্মতের অলী-আউলিয়ারাও পেয়েছেন বলে মুসলমানরা বিশ্বাস করেন। কিন্তু তা কুরআনের কোনো বিধান বাতিল করে না, কুরআনের সেবা করে। যিনি কুরআনকে প্রতিটি হাদীস ও প্রতিটি কথার ওপর রাখতে বলেন, তিনি নতুন কুরআন বানাননি।
তাহলে অনুসারীদের তিনি কী নতুন দিয়েছেন?
নতুন শরীয়ত নয়, নতুন আমল নয়; বরং পুরোনো শিক্ষায় নতুন প্রাণ। তিনি লিখেছেন, তাকওয়া ছাড়া কোনো আমল আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, তাকওয়াই প্রতিটি নেকির শিকড়। (রূহানী খাযায়েন, ১৯শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ১৫) তাঁর দাবি ছিল, তিনি এসেছেন মহানবী (সা.)-এর আনা ইসলামকে আবার জীবিত করতে, তার ভেতরে নতুন কিছু যোগ করতে নয়।
তাঁর শিক্ষার পুরো সারকথা যদি এক লাইনে বলতে হয়, তবে তা তাঁর নিজের শব্দেই আছে: আদম সন্তানের জন্য মুহাম্মদ মুস্তফা (সা.) ছাড়া কোনো রসূল নেই, আর কুরআন ছাড়া কোনো কিতাব নেই।
শুরুর সেই প্লেগের বছরে ফিরে যাই। ভয়ংকর মহামারীর মাঝে একজন মানুষ তাঁর অনুসারীদের হাতে একটি বই তুলে দিচ্ছেন, আর তাতে লিখছেন: কুরআনকে আঁকড়ে ধরো, পাঁচ ওয়াক্ত নামায মন দিয়ে পড়ো, রোযা রাখো, যাকাত দাও, হজ করো, আর মহানবী (সা.)-কে সবার ওপরে ভালোবাসো। নতুন ধর্মের প্রবর্তক এমন উপদেশ দেন না। এ হলো এমন একজন সংস্কারকের উপদেশ, যিনি মানুষকে পুরোনো, আসল ইসলামের দিকে ফিরিয়ে নিতে চান।
সংক্ষেপে
- কিশতিয়ে নূহ-তে তিনি অনুসারীদের কুরআনকে সবকিছুর ওপর রাখতে এবং পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রোযা, যাকাত ও হজ পালন করতে বলেছেন।
- তাঁর শিক্ষায় আল্লাহ এক, আর মুহাম্মদ (সা.) খাতামুল আম্বিয়া ও সব নবীর শ্রেষ্ঠ।
- তিনি স্পষ্ট লিখেছেন, মহানবী (সা.)-এর পর নতুন শরীয়তওয়ালা কোনো নবী আসতে পারেন না।
- আহমদীদের কিবলা কা‘বা, নামায একই; তাই নতুন ধর্ম, নামায, কিবলা বা কুরআনের অভিযোগ ভিত্তিহীন।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.