১৯০০ সাল। হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) লিখছেন তোহফায়ে গোলড়বিয়া। বইয়ের এই অংশে তিনি একটি গুরুতর বিষয় নিয়ে লিখছেন: মানুষ কীভাবে কোনো নবীকে এমন বিশেষ গুণ দিয়ে ফেলে, যা আর কারো মধ্যে নেই, আর এভাবে অজান্তেই শিরকের দিকে পা বাড়ায়।
লিখতে লিখতেই আল্লাহ তাঁকে সম্বোধন করে বললেন: “ইয়ালাশ খোদা হী কা নাম হ্যায়”, অর্থাৎ “ইয়ালাশ আল্লাহরই নাম।”
আপত্তিটি কী?
বিরোধীরা বলেন, “ইয়ালাশ” শব্দটি কুরআনে নেই, হাদীসে নেই, আল্লাহর নিরানব্বই নামের তালিকাতেও নেই। তাহলে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.) কীভাবে একে আল্লাহর নাম বললেন? এটি কি আল্লাহর নামে নতুন কিছু বানানো নয়?
মজার ব্যাপার, যে কথাটিকে আপত্তি হিসেবে তোলা হয়, সেটি তিনি নিজেই আগে লিখে দিয়েছেন।
তিনি নিজে কী লিখেছেন?
ইলহামটি উল্লেখ করে তিনি লিখেছেন, এটি একটি নতুন ইলহামী শব্দ। এই রূপে তিনি একে কুরআন বা হাদীসে পাননি, কোনো অভিধানেও দেখেননি। এর অর্থ তাঁর কাছে খোলা হয়েছে: “ইয়া লা শারীক”, অর্থাৎ “হে শরীকহীন সত্তা!” (তোহফায়ে গোলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৩–২০৪, টীকা)
অর্থাৎ “ইয়ালাশ” হলো “ইয়া লা শারীক” কথাটির সংক্ষিপ্ত রূপ। আর “লা শারীকা লাহু”, তাঁর কোনো শরীক নেই, এটি কুরআনেরই কথা:
যে নামের অর্থ “তাঁর কোনো শরীক নেই”, সেই নামে আপত্তির কী থাকতে পারে?
কেন এই ইলহাম, ঠিক এই সময়ে?
প্রসঙ্গটি বুঝলে ইলহামের সৌন্দর্য আরও স্পষ্ট হয়। তিনি তখন লিখছিলেন, অনেক মুসলমান বিশ্বাস করেন হযরত ঈসা (আ.) প্রায় দুই হাজার বছর ধরে আকাশে সশরীরে জীবিত, খান না, পান করেন না, বয়স বাড়ে না। এমন বিশ্বাস তাঁকে এমন এক গুণে অনন্য করে তোলে, যার নজির আর কোনো মানুষের মধ্যে নেই।
তিনি দেখিয়েছেন, কুরআন নিজেই ঈসা (আ.)-এর জন্মকেও অনন্য থাকতে দেয়নি; বলেছে তাঁর দৃষ্টান্ত আদমের মতো:
এই আলোচনার মাঝেই এল “ইয়ালাশ” ইলহাম। তিনি এর উদ্দেশ্য ব্যাখ্যা করেছেন: কোনো মানুষ এমন কোনো প্রশংসনীয় গুণ, নাম বা কাজের একমাত্র অধিকারী নয়, যা অন্য কারো মধ্যে পাওয়া যায় না। এ কারণেই প্রত্যেক নবীর গুণ ও মু‘জিযা তাঁর উম্মতের বিশেষ মানুষদের মধ্যে প্রতিফলিত হয়, যাতে অজ্ঞ লোকেরা কোনো বিশেষত্বের ধোঁকায় পড়ে কোনো নবীকে “লা শারীক” বা শরীকহীন বানিয়ে না ফেলে। তিনি স্পষ্ট লিখেছেন: কোনো নবীকে “ইয়ালাশ” নাম দেওয়া জঘন্য কুফরি। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৩–২০৪, টীকা)
তিনি আরও লিখেছেন, আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় তাঁর তাওহীদ; এর জন্যই নবীদের ধারা পৃথিবীতে এসেছে। তাই কোনো মানুষকে অস্বাভাবিক বিশেষত্ব দিও না, কারণ সেখান থেকেই শিরকের ঝরনা বের হয়। (রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০৪)
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
আল্লাহর নাম কি কুরআন-হাদীসের বাইরে থেকে আসতে পারে?
এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর নাম শুধু কুরআন-হাদীস থেকেই নিতে হবে। চলুন দেখি। প্রথমত, তিনি একে নিজের পক্ষ থেকে বানানো নাম বলেননি; আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া ইলহাম বলেছেন। দ্বিতীয়ত, এর অর্থ পুরোপুরি কুরআনের: “লা শারীকা লাহু”। কুরআন বলে, সব সুন্দর নাম আল্লাহরই, সেগুলো দিয়ে তাঁকে ডাকো (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৮১)। আর মহানবী (সা.) বলেছেন, আল্লাহর নিরানব্বইটি নাম আছে, যে এগুলো আয়ত্ত করবে সে জান্নাতে যাবে (সহীহ বুখারী, কিতাবুশ শুরূত, হাদীস ২৭৩৬)। এই হাদীস নিরানব্বইটি নামের ফযিলত বলেছে; আল্লাহর নাম যে এর বাইরে একটিও হতে পারে না, এমন কথা বলেনি। যে নামের অর্থ তাওহীদ, তা কুরআনের শিক্ষার বিপরীত নয়, বরং তার প্রতিধ্বনি।
এমন সংক্ষিপ্ত শব্দ কি আরবীর রীতি?
কুরআনের অনেক সূরা শুরু হয় বিচ্ছিন্ন অক্ষর দিয়ে, যেমন সূরা বাকারার শুরুতে “আলিফ লাম মীম” (২:২), সূরা মরিয়মের শুরুতে “কাফ হা ইয়া আঈন সাদ” (১৯:২)। এগুলোকে বলে হুরূফে মুকাত্তাআত। তফসীরের বইগুলোতে একটি প্রসিদ্ধ মত হলো, এগুলো আল্লাহর গুণবাচক নামের সংক্ষিপ্ত রূপ। আমাদের ভাষাতেও এমন সংক্ষেপ চলে, যেমন অনেক নামের আদ্যক্ষর দিয়ে ছোট রূপ বানানো হয়। “ইয়া লা শারীক” থেকে “ইয়ালাশ” তেমনই এক সংক্ষিপ্ত রূপ। রূপটি নতুন, কিন্তু অর্থটি কুরআনের মতোই পুরোনো।
তিনি কি এর মাধ্যমে নিজেকে বিশেষ কিছু দাবি করেছেন?
ঠিক উল্টো। ইলহামটি এসেছে একটি বিশেষ শিক্ষা দিতে: কোনো মানুষ, এমনকি কোনো নবীও, এমন অনন্য নন যে তাঁর গুণ আর কারো মধ্যে দেখা যাবে না; শরীকহীন শুধু আল্লাহ। যিনি লিখছেন “কোনো নবীকে ইয়ালাশ বলা কুফরি”, তিনি এই নাম দিয়ে নিজের জন্য কিছু চাননি; চেয়েছেন সব মানুষকে এক আল্লাহর দিকে ফেরাতে। নিজের সম্মান বাড়ানোর জন্য কেউ এমন ইলহাম প্রচার করে না, যার মূল শিক্ষাই হলো কোনো মানুষকে আল্লাহর আসনের কাছাকাছি না নেওয়া।
পুরো ঘটনাটি একসাথে দেখলে একটি সুন্দর মিল চোখে পড়ে। তিনি লিখছিলেন, কোনো মানুষকে, এমনকি কোনো নবীকে, এমন অনন্যতা দেওয়া যাবে না যা শুধু আল্লাহর প্রাপ্য। ঠিক তখনই ইলহাম এল এমন একটি নামে, যার অর্থ “হে শরীকহীন”। যেন আল্লাহ নিজেই সেই আলোচনার ওপর মোহর লাগিয়ে দিলেন: অনন্য, শরীকহীন কেবল তিনিই। যে শব্দটি নিয়ে আপত্তি তোলা হয়, সেটি আসলে কালেমা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”-এরই আরেকটি প্রতিধ্বনি।
সংক্ষেপে
- “ইয়ালাশ” একটি ইলহামী শব্দ; তিনি নিজেই লিখেছেন এটি এই রূপে কুরআন, হাদীস বা অভিধানে নেই।
- এর অর্থ “ইয়া লা শারীক”, হে শরীকহীন; আর “লা শারীকা লাহু” কুরআনেরই ঘোষণা (৬:১৬৪)।
- ইলহামটি এসেছিল এই শিক্ষা দিতে যে কোনো নবীকে অনন্য, শরীকহীন বানানো শিরক; শরীকহীন শুধু আল্লাহ।
- তাই এটি আল্লাহর নামে নতুন কিছু বানানো নয়, বরং তাওহীদের একটি জোরালো ঘোষণা।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.