“তুমি আমা থেকে, আমি তোমা থেকে”: এ কথার অর্থ কী?

একটি ইলহামের দুটি শব্দ, ‘আমি তোমা থেকে’, ধরে বলা হয় তিনি আল্লাহর পিতা হওয়ার দাবি করেছেন। অথচ মহানবী (সা.) নিজে এই একই বাক্য মানুষের জন্য ব্যবহার করেছেন।

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

হুদায়বিয়ার সন্ধির পরের বছর। মহানবী (সা.) উমরা শেষ করে মক্কা থেকে ফিরছেন। পথে হযরত হামযা (রা.)-এর ছোট্ট মেয়েটিকে কে লালন-পালন করবে, তা নিয়ে তিনজন সাহাবীর মধ্যে মিষ্টি একটি বিতর্ক হলো।

ফয়সালা দেওয়ার পর মহানবী (সা.) তিনজনকেই খুশি করলেন। হযরত আলী (রা.)-কে বললেন, “আনতা মিন্নী ওয়া আনা মিনকা”: তুমি আমা থেকে, আর আমি তোমা থেকে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুস সুলহ, হাদীস ২৬৯৯)

এই একই বাক্য হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর একটি ইলহামে আছে। আর সেখান থেকেই একটি আপত্তির জন্ম।

আপত্তিটি কী?

বিরোধীরা বলেন, হযরত মির্যা সাহেবের ইলহাম “আনতা মিন্নী ওয়া আনা মিনকা” (তুমি আমা থেকে, আমি তোমা থেকে)-এর অর্থ হলো আল্লাহ তাঁর থেকে এসেছেন, অর্থাৎ তিনি নাউযুবিল্লাহ আল্লাহর পিতা হওয়ার দাবি করেছেন। সঙ্গে তাঁরা ১৮৮৬ সালের একটি ভবিষ্যদ্বাণীর বাক্যও আনেন: “যেন আল্লাহ আকাশ থেকে নেমে এসেছেন।”

আপত্তিটি শুনতে ভয়ংকর। কিন্তু আরবি ভাষায় “মিন” শব্দটি কীভাবে ব্যবহৃত হয়, তা দেখলেই এর ভিত্তি সরে যায়।

আরবিতে “আমা থেকে” মানে কী?

আরবিতে “সে আমা থেকে” বা “আমি তার থেকে” বলতে সাধারণত গভীর সম্পর্ক, আপনজন হওয়া বা অনুসারী হওয়া বোঝায়, জন্মের সম্পর্ক নয়। কুরআনেই এর উদাহরণ আছে। তালূত তাঁর সৈন্যদের বলেছিলেন:

فَمَنۡ شَرِبَ مِنۡہُ فَلَیۡسَ مِنِّیۡ ۚ وَمَنۡ لَّمۡ یَطۡعَمۡہُ فَاِنَّہٗ مِنِّیۡۤ
“…অতএব, যে কেহ উহা হইতে পানি পান করিবে সে আমার মধ্য হইতে নহে, এবং যে কেহ উহার স্বাদ গ্রহণ করিবে না, নিশ্চয় সে আমার মধ্য হইতে হইবে…”
সূরা আল-বাকারা ২:২৫০
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ২:২৪৯।

পানি না খেলে কি সৈন্যরা তালূতের সন্তান হয়ে যেত? অবশ্যই না। অর্থ হলো, তারা তাঁর দলের, তাঁর আপনজন। হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর দোয়াতেও একই কথা:

فَمَنۡ تَبِعَنِیۡ فَاِنَّہٗ مِنِّیۡ
“…অতএব যে ব্যক্তি আমার অনুসরণ করে সে নিশ্চয় আমার সহিত সম্পৃক্ত…”
সূরা ইবরাহীম ১৪:৩৭

মহানবী (সা.) আশআরী গোত্র সম্পর্কে বলেছেন, তারা অভাবের সময় নিজেদের সব খাবার এক কাপড়ে জমা করে সমানভাবে ভাগ করে নেয়, “ফাহুম মিন্নী ওয়া আনা মিনহুম”: তারা আমা থেকে, আমি তাদের থেকে। (সহীহ বুখারী, কিতাবুশ শারিকা, হাদীস ২৪৮৬)

মহানবী (সা.) কি আশআরী গোত্রের সন্তান ছিলেন? হযরত আলী (রা.) কি তাঁর পিতা? প্রশ্নটিই অবান্তর। তাহলে একই বাক্য হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-এর ইলহামে এলে অর্থ বদলে যাবে কেন?

✦

ইলহামটির ব্যাখ্যা তিনি নিজেই দিয়েছেন

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, ইলহামের প্রথম অংশ (“তুমি আমা থেকে”) মানে তাঁর আবির্ভাব আল্লাহর কৃপা ও অনুগ্রহের ফল; আল্লাহ যাকে পাঠান, নিজের ইচ্ছা ও আদেশেই পাঠান। আর দ্বিতীয় অংশ (“আমি তোমা থেকে”) মানে আল্লাহর একত্ব, প্রতাপ ও সম্মানের প্রকাশ তাঁর মাধ্যমে হবে। এমন সময় আসে, যখন মনে হয় আল্লাহ যেন হারিয়ে গেছেন; মানুষ তাঁর অস্তিত্ব আর একত্বে বিশ্বাস হারায়। তখন আল্লাহ যাকে নিজের জ্যোতির প্রকাশস্থল বানান, তার মাধ্যমেই আল্লাহর পরিচয় আবার প্রকাশ পায়। (আল-হাকাম, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃষ্ঠা ৪০)

অর্থাৎ “আমি তোমা থেকে” মানে “আমার পরিচয় তোমার মাধ্যমে প্রকাশিত হবে”। জন্মের প্রশ্ন এখানে কল্পনাও করা যায় না।

“যেন আল্লাহ আকাশ থেকে নেমে এসেছেন”

দ্বিতীয় বাক্যটি ১৮৮৬ সালের ২০ ফেব্রুয়ারির প্রতিশ্রুত পুত্রের ভবিষ্যদ্বাণী থেকে নেওয়া। আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত পূর্ণ বাক্যটি এমন: সেই পুত্র হবে “প্রথম ও শেষের প্রকাশ, সত্য ও মহিমার প্রকাশ; যেন আল্লাহ আকাশ থেকে নেমে এসেছেন। তার আগমন অত্যন্ত বরকতময় হবে এবং ঐশী প্রতাপের প্রকাশের কারণ হবে।… সে দ্রুত বেড়ে উঠবে, বন্দিদের মুক্তির কারণ হবে, পৃথিবীর প্রান্ত পর্যন্ত খ্যাতি লাভ করবে, আর জাতিগুলো তার মাধ্যমে বরকত পাবে।”

এখানে “যেন” শব্দটি একটি উপমা। আর পরের বাক্যগুলোই বলে দেয়, যার কথা হচ্ছে, সে একজন মানুষ: সে বেড়ে উঠবে, খ্যাতি পাবে, জাতি তার থেকে কল্যাণ পাবে। আল্লাহ কি “বেড়ে ওঠেন”? মানে স্পষ্ট: তার আগমনের সঙ্গে আল্লাহর রহমত ও প্রতাপ যেন আকাশ থেকে নেমে আসবে।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

আল্লাহর “নেমে আসা” কথাটি কি ইসলামে আছে?

এখানে কেউ কেউ বলেন, আল্লাহর অবতরণের কথা বলাই শিরক। চলুন একটি সহীহ হাদীস দেখি:

يَنْزِلُ رَبُّنَا تَبَارَكَ وَتَعَالَى كُلَّ لَيْلَةٍ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا حِينَ يَبْقَى ثُلُثُ اللَّيْلِ الآخِرُ
“আমাদের বরকতময় ও মহান প্রভু প্রতি রাতে, যখন রাতের শেষ তৃতীয়াংশ বাকি থাকে, নিকটতম আকাশে নেমে আসেন।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তাহাজ্জুদ, হাদীস ১১৪৫

হাদীসটির শেষ অংশে আল্লাহ বলেন, কে আমাকে ডাকবে যে আমি সাড়া দেব, কে চাইবে যে আমি দেব, কে ক্ষমা চাইবে যে আমি ক্ষমা করব। আল্লাহ তো সর্বত্র বিদ্যমান, স্থান পরিবর্তন থেকে পবিত্র। তাই হাদীসের ব্যাখ্যাকারদের অনেকে লিখেছেন, এই “নেমে আসা” মানে তাঁর রহমত, দয়া ও দোয়া কবুলের কাছে আসা। এই অর্থ ইসলামে সুপরিচিত, তাই ভবিষ্যদ্বাণীর “যেন আল্লাহ নেমে এসেছেন” কথাটিও একই অর্থে বোঝা স্বাভাবিক।

তাহলে খ্রিস্টানরা কেন “রূহুম মিনহু” থেকে ঈসা (আ.)-কে খোদার পুত্র বানায়, আর মুসলমানরা তা মানে না?

ঠিক এই প্রশ্নেই আপত্তির দুর্বলতা ধরা পড়ে। কুরআন ঈসা (আ.) সম্পর্কে বলেছে, তিনি আল্লাহর “তরফ হইতে একটি রূহ (রহমত)”, আর সঙ্গে সঙ্গে বলেছে:

وَرُوۡحٌ مِّنۡہُ ۫ فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرُسُلِہٖ ۚ۟ وَلَا تَقُوۡلُوۡا ثَلٰثَۃٌ
“…এবং তাঁহার তরফ হইতে একটি রূহ (রহমত) ছিল; সুতরাং তোমরা আল্লাহ্ এবং তাঁহার রসূলগণের উপর ঈমান আন, এবং বলিও না যে, ‘(আল্লাহ্) তিন’…”
সূরা আন-নিসা ৪:১৭২

“মিনহু” (তাঁর থেকে) শব্দ থাকলেই যদি পিতা-পুত্রের সম্পর্ক বোঝাত, তাহলে খ্রিস্টানদের দাবিই ঠিক হয়ে যেত। মুসলমানরা তা মানেন না, কারণ জানেন “মিন” মানে সম্পর্ক, জন্ম নয়। একই নিয়ম এখানেও খাটে।

যিনি সারা জীবন তওহীদের কথা বলেছেন, তিনি কি এমন দাবি করতে পারেন?

হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তিনি আল্লাহর প্রকৃত একত্ব পেয়েছেন শুধু মহানবী (সা.)-এর মাধ্যমে, আর এ কথা স্বীকার না করলে তিনি অকৃতজ্ঞ হবেন। (হাকীকাতুল ওহী, পৃষ্ঠা ১১৫) যে মানুষ খ্রিস্টানদের “খোদার পুত্র” বিশ্বাস খণ্ডনে জীবন কাটিয়েছেন, তাঁর ওপর আল্লাহর পিতা হওয়ার দাবি চাপানো কোনোভাবেই ন্যায্য নয়।

সংক্ষেপে

  1. আরবিতে “তুমি আমা থেকে, আমি তোমা থেকে” মানে গভীর সম্পর্ক; মহানবী (সা.) হযরত আলী (রা.) ও আশআরী গোত্রের জন্য এই বাক্যই বলেছেন।
  2. কুরআনে তালূত ও হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর কথাতেও “আমা থেকে” মানে অনুসারী, সন্তান নয়।
  3. হযরত মসীহ মওউদ (আ.) নিজে ব্যাখ্যা দিয়েছেন: তাঁর মাধ্যমে আল্লাহর একত্ব ও প্রতাপ প্রকাশিত হবে।
  4. “যেন আল্লাহ নেমে এসেছেন” একটি উপমা, আল্লাহর রহমতের অবতরণ; তাই “পিতা হওয়ার দাবি” অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।

সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit

আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):

বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.

কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.