যাঁরা কখনো বই ছাপার কাজ দেখেছেন, তাঁরা জানেন, ছাপার ভুল কত সহজে ঢুকে পড়ে। একটি অক্ষর এদিক-ওদিক হলেই শব্দের অর্থ বদলে যায়। উর্দুতে “আউলিয়া” (اولیاء) আর “আম্বিয়া” (انبیاء) দুটি শব্দই শুরু হয় আলিফ দিয়ে, শেষ হয় “ইয়া” দিয়ে; মাঝখানের কয়েকটি অক্ষরেই পার্থক্য।
এই দুটি শব্দের একটি অদলবদল নিয়েই আজকের আপত্তি।
আপত্তিটি কী?
হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর আরবাঈন পুস্তকের একটি বাক্য নিয়ে বলা হয়, তিনি লিখেছিলেন যে “পূর্ববর্তী নবীগণের কাশফ” নিশ্চিত করেছে, প্রতিশ্রুত ব্যক্তি চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে আসবেন (রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১৭, পৃষ্ঠা ৩৭১)। বিরোধীরা বলেন, আগের সংস্করণে “নবীগণ” ছিল, পরের সংস্করণে আহমদীরা কেটে “ওলীগণ” করেছে, আর এই পরিবর্তনই প্রমাণ করে মূল কথাটি অসত্য ছিল।
মূল লেখাটি প্রসঙ্গসহ পড়ি
আরবাঈন ১৯০০ সালে কাদিয়ান থেকে প্রথম প্রকাশিত হয়। এর পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদ alislam.org-এ পাওয়া যায়। “আরবাঈন নম্বর দুই” অংশে অনুচ্ছেদটির ভাবার্থ এমন:
“হে প্রিয়জনেরা! মনে রেখো, যাঁর আসার কথা ছিল তিনি এসে গেছেন, আর যে শতাব্দীর শিরোভাগে তাঁর আসার কথা ছিল, তার সতেরো বছর পেরিয়ে গেছে। যে শতাব্দীর দিকে উম্মতের সব ওলী চোখ রেখেছিলেন, তোমাদের কথামতো সেখানে একজন ছোট মুজাদ্দিদও এলেন না, এল শুধু একজন দাজ্জাল!… সেই ব্যক্তিকে প্রত্যাখ্যানে তাড়াহুড়ো করো না, যিনি ঠিক শতাব্দীর শিরোভাগে এসেছেন, যাঁর পক্ষে রমযানের চন্দ্র ও সূর্যগ্রহণ সাক্ষ্য দিয়েছে, যাঁর প্রয়োজনীয়তা ইসলামের দুর্বলতা আর শত্রুদের লাগাতার আক্রমণ প্রমাণ করেছে, আর চতুর্দশ শতাব্দীর শিরোভাগে যাঁর আবির্ভাবের ওপর পূর্ববর্তী ওলীদের কাশফ অটুট মোহর মেরে দিয়েছে…”
লক্ষ করুন, একই অনুচ্ছেদে দুবার ওলীদের কথা এসেছে। প্রথমে বলা হয়েছে, এই শতাব্দীর দিকে উম্মতের ওলীরা চোখ রেখেছিলেন। তারপর বলা হয়েছে, পূর্ববর্তী ওলীদের কাশফ এর ওপর মোহর মেরেছে। প্রসঙ্গটাই বলে দিচ্ছে, কথা হচ্ছে এই উম্মতের বুযুর্গদের নিয়ে।
ইতিহাসও একই কথা বলে
উম্মতের বুযুর্গরা সত্যিই চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন। alislam.org-এর একটি প্রবন্ধে কয়েকটি উদাহরণ আছে। নওয়াব সিদ্দীক হাসান খান (রহ.) লিখেছিলেন, চতুর্দশ শতাব্দীর শুরুতে মাহদী ও ঈসার আবির্ভাব হলে তিনিই হবেন সেই শতাব্দীর মুজাদ্দিদ। আল্লামা আবদুল গফুর একটি বর্ণনা উল্লেখ করেছেন: “যখন এক হাজার দুইশ চল্লিশ বছর পার হবে, আল্লাহ মাহদীকে পাঠাবেন।”
আরবাঈনের শেষ দিকেও হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, তেরো শতাব্দীতেই মানুষের হৃদয় কাঁদছিল যে চতুর্দশ শতাব্দীতে অবশ্যই আল্লাহর সাহায্য আসবে; বহু মানুষ এই শতাব্দীর আগমনের জন্য কেঁদে কেঁদে কবরে চলে গেছেন। অর্থাৎ পুরো বইয়ের সুরই উম্মতের বুযুর্গদের প্রতীক্ষার কথা বলে।
আমাদের সূত্র-প্রবন্ধ অনুযায়ী, হযরত মির্যা সাহেবের জীবদ্দশায় ছাপা আরবাঈনের দুটি সংস্করণে (পৃষ্ঠা ২৩ ও ২৫) “আউলিয়ায়ে গুযাশতা”, অর্থাৎ পূর্ববর্তী ওলীগণ, শব্দই ছাপা হয়েছিল; পরবর্তী এক বুক ডিপোর ছাপানো সংস্করণে ভুলবশত “আম্বিয়া” ছাপা হয়। জামাতের পক্ষ থেকে ১৯৩০ সালেই বিরোধী আলেমদের এ বিষয়টি দেখানো হয়েছিল।
যে প্রশ্নগুলো ওঠে
“যদি ভুল ছাপা হয়েই থাকে, তাহলে সংশোধন করা কি ‘বিকৃতি’ নয়?”
না। লেখকের নিজের লেখার সাথে মিলিয়ে মুদ্রণের ভুল ঠিক করা বিকৃতি নয়, বরং বিশ্বস্ততা। বিকৃতি হতো যদি লেখক যা লেখেননি, তা তাঁর নামে চাপানো হতো। এখানে প্রসঙ্গ, একই অনুচ্ছেদের আগের বাক্য, আর তাঁর জীবদ্দশার সংস্করণ, সব একই কথা বলে: ওলীগণ। পরের কোনো সংস্করণের একটি ভুলকে লেখকের কথা বলে চালানোই বরং অন্যায়।
“ধরা যাক ‘নবীগণ’ লেখা ছিল, তাহলে কি তা মিথ্যা হয়ে যেত?”
এখানেও আপত্তিটি যতটা শক্ত মনে হয় ততটা নয়। পূর্ববর্তী নবীদের ভবিষ্যদ্বাণীতে শেষ যুগের মসীহের আগমনের কথা আছে, মহানবী (সা.)-এর হাদীসেও আছে। তবে নির্দিষ্টভাবে “চতুর্দশ শতাব্দী”র হিসাবটি এসেছে মূলত উম্মতের বুযুর্গদের কাশফ আর হিসাব থেকে। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) এই পার্থক্য ভালো করেই জানতেন, আর তাই অনুচ্ছেদটির শুরুতেই “উম্মতের ওলীগণ” কথাটি লিখেছেন।
“আহমদীরা কি নিজেদের সুবিধামতো বই বদলায়?”
আহমদীয়া মুসলিম জামাত হযরত মসীহ মওউদ (আ.)-কে আল্লাহর প্রেরিত বলে বিশ্বাস করে। তাঁর লেখা ইচ্ছাকৃতভাবে বদলানো একজন আহমদীর কাছে গুরুতর গুনাহ। আর তাঁর বইগুলো আজ alislam.org-এ মূল উর্দু ও অনুবাদসহ সবার জন্য উন্মুক্ত। যিনি বই লুকাতে চান, তিনি তা বিনামূল্যে সারা দুনিয়ার সামনে রাখেন না।
সংক্ষেপে
- আরবাঈনের অনুচ্ছেদটির প্রসঙ্গ উম্মতের ওলীদের নিয়ে; একই অনুচ্ছেদে আগেও “উম্মতের ওলীগণ” কথাটি আছে।
- alislam.org-এর পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি অনুবাদে বাক্যটি “পূর্ববর্তী ওলীদের কাশফ”।
- সূত্র-প্রবন্ধ অনুযায়ী তাঁর জীবদ্দশার সংস্করণে “আউলিয়া” ছিল; “আম্বিয়া” পরবর্তী এক সংস্করণের মুদ্রণ-ভুল।
- উম্মতের বুযুর্গরা সত্যিই চতুর্দশ শতাব্দীর দিকে তাকিয়ে ছিলেন; ইতিহাস এই বক্তব্যকেই সমর্থন করে।
সূত্র ও কৃতজ্ঞতাSources and credit
আরও পড়ুন ও যাচাই করুন (প্রধান সূত্র alislam.org):Read more and verify (main source alislam.org):
- Arba‘in – Forty Announcements (English translation, PDF) · alislam.org
- Arba'in – by the Promised Messiah · alislam.org
- Conclusion of the 14th Century and A Moment of Reflection for the Muslims · alislam.org
বিষয়টির দলিল-সংকলনের জন্যFor compiling the evidence on this topic, our thanks to alimammahdi.wordpress.com-এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। ভাষা ও উপস্থাপনা নতুন।. The wording and presentation here are new.
কুরআনের আয়াত নম্বর আহমদীয়া গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত।Quran verse numbers follow the Ahmadiyya count, where Bismillah is the first verse.