“সময়ের হিসাবে তিনি সবার শেষে এসেছেন”: এটাই কি খাতামিয়্যাতের পুরো অর্থ?

বিরোধীরা বলেন, খাতামান নাবিয়্যীন মানে শুধু এটুকু: তিনি সময়ের দিক থেকে শেষে এসেছেন। কিন্তু মহানবী (সা.) নিজে বলেছেন, আদম (আ.) যখন মাটির খামিরে, তখনই তিনি খাতামান নাবিয়্যীন। সময়ের হিসাবে এই কথার অর্থ কী?

৭ মিনিটে পড়ুন7 min read · in Bangla

একটি দৌড় প্রতিযোগিতার কথা ভাবুন। সবার শেষে যে দৌড়বিদ ফিনিশ লাইন পার হলেন, তাঁকে কি আমরা সেরা বলি? না। শেষে আসা নিজে কোনো সম্মান নয়।

এই সাধারণ কথাটি দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম নানুতুবী (রহ.)-ও লিখে গেছেন: সাধারণ মানুষের ধারণা, খাতাম মানে তাঁর যুগ আগের নবীদের পরে; কিন্তু অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্নদের কাছে স্পষ্ট যে সময়ের ক্রমে আগে-পরে আসায় নিজস্ব কোনো মর্যাদা নেই; তাহলে এই আয়াত মহানবী (সা.)-এর প্রশংসা হয় কীভাবে (তাহযীরুন নাস, পৃষ্ঠা ৩)?

وَلٰکِنۡ رَّسُوۡلَ اللّٰہِ وَخَاتَمَ النَّبِیّٖنَ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمًا
“…কিন্তু সে আল্লাহ্‌র রসূল এবং নবীগণের মোহর; এবং আল্লাহ্ সকল বিষয়ে সর্বজ্ঞানী।”
সূরা আল-আহযাব ৩৩:৪১
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৩৩:৪০।

আদম (আ.)-এর আগেই খাতাম

হযরত ইরবায বিন সারিয়া (রা.) বর্ণনা করেন, মহানবী (সা.) বলেছেন:

إِنِّيْ عِنْدَ اللّٰهِ مَكْتُوْبٌ خَاتَمُ النَّبِيِّيْنَ وَإِنَّ آدَمَ لَمُنْجَدِلٌ فِي طِيْنَتِهِ
“নিশ্চয় আমি আল্লাহর কাছে তখনই খাতামান নাবিয়্যীন হিসেবে লিপিবদ্ধ ছিলাম, যখন আদম তখনো তাঁর মাটির খামিরে মিশে ছিলেন।”
মিশকাতুল মাসাবীহ, কিতাবুল ফাযায়েল, বাবু ফাযায়েলি সাইয়িদিল মুরসালীন

খাতামিয়্যাত যদি শুধু সময়ের দিক থেকে শেষে আসা হতো, তাহলে প্রথম মানুষ সৃষ্টির আগেই তিনি “খাতাম” হলেন কীভাবে? হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) এই হাদীস নিয়ে বলেছেন: কী মহান ধারণা! খাতামিয়্যাত কোনো নির্দিষ্ট সময়ের অধীন নয়। তাঁর আগে বা পরে কোনো নবী তাঁর নবুয়্যতের সমান হতে পারেন না; আর তাঁর পরে কেউ আসতে চাইলে, হয় তাঁর অনুগত হয়ে আসবেন, নয়তো আসবেনই না।

আরবি “আখির” শব্দের ব্যবহার

মহানবী (সা.) নিজেকে “শেষ নবী” বলেছেন, এটাও সত্য। কিন্তু একই বাক্যে তিনি আরও কিছু বলেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন:

فَإِنِّي آخِرُ الأَنْبِيَاءِ وَإِنَّهُ آخِرُ الْمَسَاجِدِ
“নিশ্চয় আমি শেষ নবী, আর এটি (আমার মসজিদ) শেষ মসজিদ।”
সুনান নাসাঈ, কিতাবুল মাসাজিদ, হাদীস ৬৯৪; সহীহ মুসলিম, কিতাবুল হজ্জেও বর্ণিত

মসজিদে নববীর পরে কি পৃথিবীতে আর কোনো মসজিদ হয়নি? লক্ষ লক্ষ মসজিদ হয়েছে। অর্থ হলো, নবী (সা.)-এর মসজিদের মর্যাদা আর কোনো মসজিদ পাবে না; আর যত মসজিদ হবে, সব তাঁরই শিক্ষার পথে। ঠিক তেমনি তিনি শেষ নবী এই অর্থে যে তাঁর শরীয়ত শেষ ও পূর্ণ, কেউ তা রহিত করবে না, আর তাঁর পরে যে মর্যাদাই আসুক, আসবে তাঁরই অধীনে।

আরবিতে “আখির” শব্দটি এভাবে ব্যবহারের নজির আরও আছে। আলইসলাম ডট অর্গে উল্লেখ আছে, ইমাম সুয়ূতী (রহ.) ইমাম ইবনে তাইমিয়াকে বলেছেন মুজতাহিদদের “শেষ”, অথচ তার পরেও বহু মুজতাহিদ এসেছেন।

✦

আহমদী মুসলমানরা কোন অর্থে তাঁকে শেষ বলেন

আহমদী মুসলমানরা “শেষ নবী” অর্থকে অস্বীকার করেন না, শুধু তার সঠিক সীমা দেখান। শরীয়তের দিক থেকে তিনি শেষ নবী। স্বাধীন নবীদের সারিতেও তিনি শেষ; আলইসলাম ডট অর্গে প্রকাশিত “Truth Prevails” বইয়ে লেখা আছে, আদম (আ.) থেকে মহানবী (সা.) পর্যন্ত যাঁরা নিজ নিজ স্থানে স্বাধীন নবী ছিলেন, তিনি তাঁদের মধ্যে শেষ।

আর হযরত খলীফাতুল মসীহ সানী (রা.) তফসীরে সগীরে মিরাজের উদাহরণ দিয়েছেন: মিরাজে মহানবী (সা.) সব আসমান পেরিয়ে সবার উপরে উঠেছেন। পৃথিবী থেকে তাকালে সবার শেষে দেখা যাবে তাঁকেই। এই অর্থে তিনি শেষ, কারণ তিনি সবার উপরে (তফসীরে সগীর, পৃষ্ঠা ৫৫১)।

ভেবে দেখুন, কুরআন খাতামান নাবিয়্যীন উপাধিটি এনেছে প্রশংসার জায়গায়, শত্রুদের খোঁটার জবাবে। “তিনি সময়ের হিসাবে সবার শেষে এসেছেন”, শুধু এটুকু কি সেই খোঁটার জবাব হতে পারে? শত্রুরা বলছিল তিনি নির্বংশ। জবাবে যদি বলা হয় তিনি শেষ, তাঁর পরে আর কেউ নেই, তাহলে তো খোঁটা আরও জোরালো হয়। প্রশংসা হয় তখনই, যখন অর্থটি হয় মর্যাদার: তিনি সবার সত্যায়ক, সবার উপরে, আর তাঁর আধ্যাত্মিক বংশধারা অফুরন্ত।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

একটি বর্ণনায় আছে, তিনি সৃষ্টিতে প্রথম আর প্রেরণে শেষ; তাহলে?

এই বর্ণনার সনদ নিয়ে আলেমদের আলোচনা আছে। কিন্তু তর্কের খাতিরে মেনে নিলেও, আহমদী মুসলমানদের সঙ্গে কোনো বিরোধ নেই। স্বাধীন নবী হিসেবে প্রেরিত হওয়ার সারিতে তিনি সবার শেষে এসেছেন, আহমদী মুসলমানরাও তাই বলেন। তাঁর পরে যিনি আসার কথা, তিনি আলাদা কোনো প্রেরণ নিয়ে আসবেন না, আসবেন তাঁরই উম্মতী হয়ে, তাঁরই নবুয়্যতের ছায়া হয়ে। ছায়া মূল বস্তুর আলাদা অস্তিত্ব নয়।

বিরোধী আলেমদের বিশ্বাসে কি তিনি সময়ের হিসাবে শেষ?

এটাই লক্ষ করার মতো। প্রচলিত বিশ্বাসে ঈসা (আ.) শেষ যুগে নেমে আসবেন, আর সহীহ মুসলিমের বর্ণনায় তাঁকে “আল্লাহর নবী” বলা হয়েছে, এমনকি আল্লাহ তাঁর প্রতি ওহী করবেন। তাহলে পৃথিবীতে নবী হিসেবে সক্রিয় শেষ ব্যক্তি হবেন ঈসা (আ.), মহানবী (সা.) নন। অর্থাৎ শুধু “সময়ের হিসাবে শেষ” অর্থটি তাঁদের নিজেদের বিশ্বাসেই টেকে না। টেকে শুধু সেই অর্থ, যা মর্যাদা ও শরীয়তের সঙ্গে যুক্ত।

তাহলে কি আহমদী মুসলমানরা মহানবী (সা.)-এর সর্বশেষ হওয়ার মর্যাদা কমাচ্ছেন?

উল্টো। হযরত মসীহ মওউদ (আ.) লিখেছেন, পবিত্র গুণাবলিতে কোনো নবী, এমনকি ফিরিশতারাও মহানবী (সা.)-এর সমান হতে পারেন না (বারাহীনে আহমদীয়া, রূহানী খাযায়েন, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৬৮)। শেষে আসা নিজে কোনো প্রশংসা নয়; সবার উপরে থাকা, সবার সত্যায়ক হওয়া, চিরস্থায়ী শরীয়ত পাওয়া, এগুলোই আসল মর্যাদা। আহমদী মুসলমানরা তাঁকে এই সব অর্থেই “শেষ” মানেন।

সংক্ষেপে বললে, “শেষ” শব্দটি আহমদী মুসলমানরা অস্বীকার করেন না, বরং একে আরও গভীর অর্থে বোঝেন। শেষ মানে চূড়ান্ত, পূর্ণ, সর্বোচ্চ। এই অর্থে মহানবী (সা.)-এর চেয়ে বেশি “শেষ” আর কেউ নন।

সংক্ষেপে

  1. আদম (আ.) সৃষ্টির আগেই মহানবী (সা.) খাতামান নাবিয়্যীন ছিলেন; তাই খাতামিয়্যাত সময়ের অধীন নয়।
  2. “আমি শেষ নবী, আমার মসজিদ শেষ মসজিদ” হাদীস দেখায়, “শেষ” মানে মর্যাদা ও অনুসরণের কেন্দ্র, সব কিছুর থেমে যাওয়া নয়।
  3. আহমদী মুসলমানরা মানেন, তিনি শরীয়তবাহী ও স্বাধীন নবীদের মধ্যে শেষ।
  4. প্রচলিত বিশ্বাসে ঈসা (আ.) নবী হিসেবে পরে আসবেন; তাই শুধু সময়ের অর্থ তাঁদের বিশ্বাসেও টেকে না।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.