কুরআনে কি ইমাম মাহদী (আ.)-এর আগমনের কথা আছে?

কুরআনে ‘মাহদী’ নামটি নেই, তবু তাঁর আগমনের সংবাদ সেখানে স্পষ্ট। একটি আয়াত, সালমান ফারসী (রা.)-এর কাঁধে রাখা একটি হাত, আর মূসা (আ.)-এর উম্মতের সাথে একটি মিল সেই সংবাদ খুলে দেয়।

৬ মিনিটে পড়ুন6 min read · in Bangla

বাংলাদেশের যে কোনো গ্রামের মসজিদে ওয়াজ শুনলে একটি কথা প্রায়ই কানে আসে: শেষ যুগে ইমাম মাহদী (আ.) আসবেন। শিয়া হোক বা সুন্নি, হানাফি হোক বা আহলে হাদীস, এ বিশ্বাসে প্রায় সবাই এক।

কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করেন, “কুরআনে কি মাহদীর কথা আছে?” তখন অনেকেই থমকে যান। কারণ কুরআনে “মাহদী” নামটি সরাসরি নেই।

তবে নাম না থাকলেও সংবাদ আছে। কুরআন অনেক সময় নাম না বলে কাজ, সময় আর লক্ষণ দিয়ে কাউকে চিনিয়ে দেয়। চলুন, এমন কয়েকটি আয়াত ধীরে ধীরে দেখি।

“অন্য লোকেরা, যারা এখনও মিলিত হয়নি”

সূরা জুমু‘আর শুরুতে আল্লাহ্ তা‘লা মহানবী (সা.)-এর আগমনের কথা বলেছেন। তিনি আরবের নিরক্ষর জাতির মাঝে এসেছিলেন, তাদের আয়াত শুনিয়েছেন, পবিত্র করেছেন, কিতাব শিখিয়েছেন। ঠিক তার পরের আয়াতটি এই:

وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ ۚ وَهُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ
“এবং (তিনি তাহাকে আবির্ভূত করিবেন) তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও যাহারা এখন পর্যন্ত তাহাদের সঙ্গে মিলিত হয় নাই। এবং তিনি মহাপ্ররাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।”
সূরা আল-জুমু‘আ ৬২:৪
অনুবাদ: আহমদীয়া মুসলিম জামাতের বাংলা কুরআন। আহমদীয়া গণনায় বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় এটি ৬২:৩।

আয়াতটি বলছে, মহানবী (সা.)-এর আগমন শুধু সাহাবীদের যুগেই শেষ নয়। পরবর্তী এক দলের মাঝেও তাঁর আগমন ঘটবে, যারা তখনও সাহাবীদের সাথে মিলিত হয়নি। প্রশ্ন জাগে, তারা কারা?

ঠিক এই প্রশ্নটিই সাহাবীরা করেছিলেন। হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন:

كُنَّا جُلُوسًا عِنْدَ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم فَأُنْزِلَتْ عَلَيْهِ سُورَةُ الْجُمُعَةِ {وَآخَرِينَ مِنْهُمْ لَمَّا يَلْحَقُوا بِهِمْ} قَالَ قُلْتُ مَنْ هُمْ يَا رَسُولَ اللَّهِ فَلَمْ يُرَاجِعْهُ حَتَّى سَأَلَ ثَلاَثًا، وَفِينَا سَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ، وَضَعَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَدَهُ عَلَى سَلْمَانَ ثُمَّ قَالَ: لَوْ كَانَ الإِيمَانُ عِنْدَ الثُّرَيَّا لَنَالَهُ رِجَالٌ ـ أَوْ رَجُلٌ ـ مِنْ هَؤُلاَءِ
“আমরা নবী (সা.)-এর কাছে বসে ছিলাম, তখন তাঁর উপর সূরা জুমু‘আ অবতীর্ণ হলো: ‘আর তাদের মধ্য থেকে অন্যদের মাঝেও, যারা এখনও তাদের সাথে মিলিত হয়নি।’ আমি জিজ্ঞেস করলাম, হে আল্লাহর রসূল! তারা কারা? তিনি উত্তর দিলেন না, এমনকি তিনবার জিজ্ঞেস করা হলো। আমাদের মাঝে সালমান ফারসী (রা.) ছিলেন। রসূলুল্লাহ (সা.) সালমানের উপর হাত রাখলেন, তারপর বললেন: ঈমান যদি সুরাইয়া নক্ষত্রের কাছেও চলে যায়, তবুও এদের মধ্য থেকে কিছু লোক, অথবা একজন লোক, তা অবশ্যই ফিরিয়ে আনবে।”
সহীহ বুখারী, কিতাবুত তফসীর, সূরা আল-জুমু‘আ, হাদীস ৪৮৯৭

দৃশ্যটি একটু ভাবুন। প্রশ্ন ছিল আয়াতের “অন্য লোকেরা” কারা। উত্তরে মহানবী (সা.) একজন পারস্য বংশের সাহাবীর কাঁধে হাত রাখলেন, আর এমন এক সময়ের কথা বললেন যখন ঈমান পৃথিবী থেকে উঠে আকাশের তারার কাছে চলে যাবে।

অর্থাৎ শেষ যুগে, যখন মুসলমানদের মাঝে ঈমান প্রায় হারিয়ে যাবে, তখন পারস্য বংশের একজন মানুষ তা ফিরিয়ে আনবেন। তাঁর মাধ্যমেই যেন মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমন ঘটবে, তাঁরই ছায়া ও অনুসারী হিসেবে। আহমদীয়া মুসলিম জামাত বিশ্বাস করে, এই সংবাদ পূর্ণ হয়েছে হযরত মির্যা গোলাম আহমদ (আ.)-এর মাধ্যমে, যিনি ছিলেন পারস্য বংশোদ্ভূত।

✦

মূসা (আ.)-এর মতো একজন রসূল

কুরআন মহানবী (সা.)-কে মূসা (আ.)-এর সাথে তুলনা করেছে। আল্লাহ্ বলেন:

إِنَّا أَرْسَلْنَا إِلَيْكُمْ رَسُولًا شَاهِدًا عَلَيْكُمْ كَمَا أَرْسَلْنَا إِلَىٰ فِرْعَوْنَ رَسُولًا
“নিশ্চয় আমরা তোমাদের নিকট প্রেরণ করিয়াছি এক রসূল তোমাদের উপর সাক্ষীস্বরূপ, যেরূপে ফেরআউনের নিকট প্রেরণ করিয়াছিলাম একজন রসূল,”
সূরা আল-মুয্‌যাম্মিল ৭৩:১৬

এখানে ছোট্ট একটি শব্দ খুব গুরুত্বপূর্ণ: “যেরূপে”। দুজনই শরীয়তবাহী নবী। দুজনের উম্মতের ইতিহাসেও তাই মিল থাকার কথা।

মূসা (আ.)-এর পর বনী ইসরাঈলে বহু নবী ও সংস্কারক এসেছিলেন। তারপর মূসা (আ.)-এর প্রায় চৌদ্দশো বছরের মাথায় এলেন একজন মসীহ্, হযরত ঈসা (আ.)। তিনি নতুন শরীয়ত আনেননি, তওরাতেরই সেবক ছিলেন। মিল যদি পূর্ণ হতে হয়, তবে মহানবী (সা.)-এর উম্মতেও চৌদ্দশ শতাব্দীতে একজন মসীহ্ আসার কথা, যিনি কুরআনেরই সেবক হবেন।

খিলাফতের প্রতিশ্রুতি

একই মিলের কথা আরেকটি আয়াতে আরও স্পষ্ট:

وَعَدَ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَيَسْتَخْلِفَنَّهُمْ فِي الْأَرْضِ كَمَا اسْتَخْلَفَ الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ
“তোমাদের মধ্য হইতে যাহারা ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, আল্লাহ্ তাহাদের সঙ্গে ওয়াদা করিয়াছেন যে, তিনি অবশ্যই তাহাদিগকে পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করিবেন যেভাবে তিনি তাহাদের পূর্ববর্তীগণকে খলীফা নিযুক্ত করিয়াছিলেন;…”
সূরা আন-নূর ২৪:৫৬

আবার সেই শব্দ: “যেভাবে”। পূর্ববর্তীদের মধ্যে আল্লাহ্ যেমন খলীফা দাঁড় করিয়েছিলেন, এই উম্মতেও তেমনি দাঁড় করাবেন। আয়াতে “তোমাদের মধ্য হইতে” কথাটিও লক্ষ্য করার মতো। এই খলীফারা বাইরে থেকে আসবেন না, উম্মতের ভেতর থেকেই উঠবেন।

মহানবী (সা.) নিজেও এই ধারার কথা বলে গেছেন। তিনি বলেছেন, প্রথমে নবুওয়ত থাকবে, তারপর নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত, তারপর অত্যাচারী রাজত্ব, তারপর জবরদস্তির শাসন, আর সবশেষে আবার “নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত” প্রতিষ্ঠিত হবে। এ কথা বলে তিনি নীরব হয়ে যান (মুসনাদ আহমদ বিন হাম্বল, ৪র্থ খণ্ড, পৃষ্ঠা ২৭৩)।

শেষ যুগে আবার নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত আসবে কীভাবে? একজন আল্লাহ-প্রেরিত সংস্কারকের মাধ্যমে, যাঁর পরে খিলাফতের ধারা চলবে। ঠিক যেমন মহানবী (সা.)-এর পরে খোলাফায়ে রাশেদীন এসেছিলেন।

এই আয়াতগুলো একসাথে পড়লে ছবিটি পরিষ্কার হয়। কুরআন একজন আগমনকারীর কথা বলছে, যিনি মহানবী (সা.)-এর অনুসারী হবেন, উম্মতের মধ্য থেকে আসবেন, ঈমান হারিয়ে যাওয়ার যুগে আসবেন, আর মূসা (আ.)-এর উম্মতের মসীহের মতো উম্মতে মুহাম্মদীয়ার মসীহ্ হবেন। হাদীসে তাঁকেই বলা হয়েছে ইমাম মাহদী ও মসীহ্ মওউদ।

যে প্রশ্নগুলো ওঠে

“আখারীনা মিনহুম” তো পরবর্তী যুগের সাধারণ মুসলমান, একজন মানুষ নয়?

কেউ কেউ বলেন, আয়াতের “অন্য লোকেরা” মানে শুধু তাবেঈন বা পরে ইসলাম গ্রহণকারী অনারব মুসলমানরা। চলুন আয়াতের গঠনটা দেখি। আগের আয়াতে বলা হয়েছে, আল্লাহ্ উম্মীদের মধ্যে “এক রসূল আবির্ভূত করিয়াছেন”; আর এই আয়াত বলছে, “তাহাদের মধ্য হইতে অন্য লোকের মধ্যেও” তিনি তাঁকে আবির্ভূত করবেন। অর্থাৎ কথা শুধু অন্য লোকদের নিয়ে নয়, তাদের মাঝে রসূলের আবির্ভাব নিয়ে।

আর মহানবী (সা.)-এর উত্তরটি সময়ও বলে দিয়েছে: যখন ঈমান সুরাইয়া নক্ষত্রে চলে যাবে। তাবেঈনদের যুগ তো এমন ছিল না। মহানবী (সা.) নিজেই বলেছেন, “সর্বোত্তম মানুষ আমার যুগের, তারপর তাদের পরবর্তীরা, তারপর তাদের পরবর্তীরা” (সহীহ বুখারী, কিতাবুশ শাহাদাত, হাদীস ২৬৫২)। যে যুগকে তিনি সেরা বলেছেন, সেটি ঈমান হারিয়ে যাওয়ার যুগ হতে পারে না। তাই এটি শেষ যুগের কথা।

এই পারস্য বংশীয় ব্যক্তি কি ইমাম আবু হানিফা (রহ.) নন?

একটি প্রচলিত মত হলো, হাদীসটি ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর দিকে ইঙ্গিত করে। তিনি নিঃসন্দেহে উম্মতের এক মহান ইমাম। কিন্তু তাঁর জন্ম হিজরী ৮০ সনের দিকে, অর্থাৎ ঠিক সেই উত্তম যুগগুলোর ভেতরেই। তখন ঈমান আকাশে উঠে যায়নি, তাই তাঁকে সেখান থেকে ফিরিয়ে আনার প্রশ্নও ছিল না। তা ছাড়া আয়াতটি রসূলের দ্বিতীয় আবির্ভাবের কথা বলছে, শুধু একজন ফকীহের নয়।

“নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত” তো খোলাফায়ে রাশেদীনের সময়েই হয়ে গেছে?

হাদীসটি আবার মনোযোগ দিয়ে পড়ুন। “নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত” কথাটি সেখানে দুবার এসেছে। প্রথমবার নবুওয়তের ঠিক পরে, সেটি খোলাফায়ে রাশেদীন। দ্বিতীয়বার এসেছে অত্যাচারী রাজত্ব আর জবরদস্তির শাসনের পরে, একেবারে শেষে। তাই দ্বিতীয় খিলাফত অবশ্যই পরবর্তী যুগের, আর নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত শুরু হয় আল্লাহর পাঠানো একজনের হাত ধরে।

সংক্ষেপে

  1. কুরআনে “মাহদী” নাম নেই, কিন্তু তাঁর আগমনের সংবাদ একাধিক আয়াতে আছে।
  2. সূরা জুমু‘আর ৪ আয়াতের ব্যাখ্যায় মহানবী (সা.) সালমান ফারসী (রা.)-এর উপর হাত রেখে বলেছেন, পারস্য বংশের একজন হারানো ঈমান ফিরিয়ে আনবেন (বুখারী ৪৮৯৭)।
  3. মহানবী (সা.) মূসা (আ.)-এর মতো রসূল; তাই দুই উম্মতের ইতিহাসে মিল থাকবে, আর মূসা (আ.)-এর উম্মতের মতো এই উম্মতেও একজন মসীহ্ আসবেন।
  4. সূরা নূরের খিলাফতের প্রতিশ্রুতি আর “নবুওয়তের পদ্ধতিতে খিলাফত”-এর হাদীস একই আগমনের দিকে ইঙ্গিত করে।

আরও পড়তে চাইলেFurther reading

কুরআনের আয়াত নম্বর এমন গণনায়, যেখানে বিসমিল্লাহ প্রথম আয়াত; প্রচলিত গণনায় সাধারণত এক কম।Quran verse numbers count Bismillah as the first verse; in the common count they are usually one less.

আলোচনাDiscussion

প্রশ্ন, ভিন্নমত বা নতুন দলিল, সবই স্বাগত। শুধু ভদ্র ভাষায় লিখুন: গালি, হুমকি, অশ্লীলতা বা বিজ্ঞাপন স্বয়ংক্রিয়ভাবে সরিয়ে দেওয়া হয়।Questions, disagreement or new evidence are all welcome. Just keep it civil: abuse, threats, obscenity and adverts are removed automatically.

ইমেইল বা ফোন নম্বর লাগবে না। আপনার নাম ও মন্তব্য সবার জন্য প্রকাশিত হবে।No email or phone number needed. Your name and comment will be shown publicly.